ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়
রমেনবাবু বড্ড রেগেছেন। মেয়ের অমন সুন্দর স্কার্টটা একেবারে কিনা পুড়িয়ে ঝামা করে দিয়েছে লন্ড্রি। মুখ কাঁচুমাচু করে মালিক বলল, বাবু বড্ড ভুল করে ফেলেছে আমার মেয়েটা। নাহয় দামটা আমি দিয়ে দেব।
-দাম? রমেনবাবু রেগে তো ফায়ার, আমার মেয়ের সাধের ফ্রক কত সাধ করে নিউ মার্কেট থেকে কিনেছিলুম। শুধু দাম দিলে হবে?
-বাবু বড্ড গরিব মেয়েটা। একটু যদি ক্ষমা করে দ্যান তো-
-ওসব হবে না। আমাকে সেই মেয়েটার কাছে নিয়ে চল। ওকে আমি শাস্তি দেব।
লন্ড্রির মালিক আর কি করবে। বড়লোকের খেয়াল। আর মালিক লোকটাও খুব নিরীহ ছিল। অগত্যা পরের দিন রমেনবাবুকে নিয়ে চলল মেয়েটির কাছে। রমেনবাবুর হাতে একটা প্যাকেট।
-এই নাও।
ভীত মেয়েটি প্যাকেট খুলল কাঁপা হাতে। বেরোল ঠিক সেই রকম একটা স্কার্ট যেটা পুড়ে গিয়েছিল।
মালিক তো অবাক। বলল, সেকি শাস্তির বদলে পুরস্কার স্যার?
পুরস্কার? বাঁকা হেসে রমেনবাবু মনে মনে বললেন, পরে বুঝবে ঠেলাটা।
পরের দিন লন্ড্রি বন্ধ ছিল। মেয়েটি ভাবল নতুন সেই জামাটা পরে বাইরে একটু ঘুরে আসে। এত সুন্দর জামা তার হবে সে স্বপ্নেও ভেবে পায় নি। ঝলমলে জামাটা পরে একটা ভাঙ্গা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখল নিজেকে। মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতে তার মনে হল যেন সে নয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রঙিন এক প্রজাপতি। ডানা মেলে ওড়ার মত সে ছুটে বেরোতে চাইল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কে যেন তার পা টেনে ধরল। হঠাৎ তার মনে হল, আরে এটা কি হল? ভদ্রলোকের মেয়ের এমন সাধের জামাটা সে পুড়িয়ে দিয়ে আবার নিজেই সেই রকম জামা পরে বেরোবে? তার বয়েসী ছোট্ট মেয়েটার অদেখা মুখ ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। কিন্তু সেই বা কি করে? জামাটা সে তো আর ইচ্ছে করে পোড়ায় নি? অসতর্ক ভাবে পুড়ে গেছে। কিন্তু মনে হল তার তো সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। হয়ত জামাটা পুড়ে যাওয়ার জন্যে তার বয়েসী মেয়েটি খুব দুঃখ পেয়েছিল। সুন্দর জামাটা পেয়ে সে যেমন প্রথমে আনন্দিত হয়েছে ঠিক তেমনই সেটা পুড়ে যেতে ওই মেয়েটির মনে ততটাই আঘাত লেগেছে।
এরপর থেকে যতবার জামাটা সে পরতে গেছে কিছুতেই পরতে পারে নি। পরার মুহূর্তেই মেয়েটির মুখখানা তার চোখে ভাসে। কিন্তু মালিককে তো এটা ফিরিয়ে দিতে বলা যায় না। তাহলে মানী মানুষের মানহানি হতে পারে। কিন্তু সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল আর অন্যের পয়সায় নয়, নিজের রোজগার দিয়ে জামা কিনে সে পরবে। যেমন সাধ্য তেমন পরবে। আর যে চাকরিতে পরের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা সে চাকরি সে করবে না।
লন্ড্রির চাকরি ছেড়ে সে একটা লাইব্রেরির ফাই-ফরমাশ খাটা চাকরি নিল। বইয়ের পাহাড় দেখে তার চোখ যেমন জুড়িয়ে গেল মনও তেমন ভরে গেল। আহা এ যেন এক নতুন জগতে ঢুকেছে সে যেন এক নতুন স্বর্গে।
বইকে ভালপবাসতে শিখেছিল সে। বই তাকে পথ দেখাল। অন্ধকার থেকে আলোর পথ। প্রাথমিক মাধ্যামিক পাঠের সীমা ডিঙ্গিয়ে সে চলে গেল ডাক্তারি ক্লাস করতে। আজ সে একজন নিবিষ্ট চিকিৎসক। পেশাদারিত্বকে সঙ্গে নিয়েও সে খুলল চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি। এছাড়াও সে তার সঞ্চিত রোজগার থেকে গরিবদের সাহায্য করত।
আজও সে ভোলে নি তার শৈশবের কথা। সেই জামা পুড়ে যাওয়ার কথা। প্রতি পুজোয় সে চেষ্টা করে শিশুদের মধ্যে সাধ্যমত জামা বিতরণ করতে। রমেনবাবুর সেই মেয়েটির অদেখা মুখ সে আজ দেখতে পায় সব শিশুদের মধ্যে।
No comments:
Post a Comment