বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী
বোলেরো গাড়িটা চড়ে আমরা চলেছি নদীর কিনারায় বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরন্যের ভিতর দিয়ে একটা সরকারী বদান্যতায় তৈরি রাস্তা ধরে । আমরা বলতে আমি ড: স্নিকাশ বিসান্ত , আমার বড় শালা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রিসভ সাক্সেনা , আমার খুড়তুতো ভাই ক্রিকেট খেলোয়াড় প্যাট্রিক বিসান্ত ও আমার উঠতি বয়েসের শ্যালিকা অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে পাঠরতা লিজা রেহানা । সঙ্গের ড্রাইভার আমাদের গড় বয়েসের চেয়ে বছর সাত বেশিই হবে ভিক্টর লালথানহাওলা । চৌখস ড্রাইভার , বছর চব্বিশ পঁচিশ ড্রাইভিং লাইনে হল ।
যে রাস্তা দিয়ে আমরা চলেছি তা মহামান্য সরকার বাহাদুর নাও বানাতে পারতেন । কিন্তু চোরাই কাঠের ব্যবসায়ী ও অসাধু কাঠুরিয়া কিছু মানুষের দৌরাত্ম্যে ম্যানগ্রোভ অরণ্য প্রকৃতির ক্রোড় থেকে নিঃশেষ হতে বসেছে ।
তা বাঁচানোর মহৎ কর্তব্য পালন করা যাতে আয়াসসাধ্য হয় সেকারণেই এই চারচাকা চালানো যায় এমন রাস্তাটার দুর্ভেদ্য প্রবেশাধিকার ।
ঘন ম্যানগ্রোভের জঙ্গল আমাদের কাছে নতুন কিছু নয় । নতুন যে জিনিসটা হতে যাচ্ছে সেটা হল ওই দুর্ভেদ্য অরণ্যের মধ্যে যে দু'তিনটে পুরোনো বাংলো বাড়ি ইতিপূর্বে সরকার বানিয়ে রেখেছেন সেগুলোর আধুনিকীকরণ । আমরা এই রাস্তা ধরে যাব প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার । নদী বরাবর জঙ্গল । ঘন জঙ্গলের বুক চিরে ঔদ্ধত্যপূর্ণ দৌরাত্ম্য দেখিয়ে যেন রাস্তায় আমাদের বোলেরো গোঁ গোঁ শব্দে পৌঁছে যাবে বাংলো বাড়ি গুলোর চৌহদ্দির নাগালে ।
আমরা থম মেরে বোলেরোর আরাম নিতে নিতে উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছি এই ভোঁতা একঘেঁয়ে জার্নির শেষ তক । দু'একটা হরিণ , বন্য বরাহ , বিষাক্ত সাপ , বানর আমাদের রাস্তা কেটে বেরিয়ে যেতে দেখলাম । তারা আমাদের আক্রমন করার চেয়ে নিষ্ক্রান্ত হতেই বেশি উদ্যোগী মনে হল । আমার বড় শালার সঙ্গে লাইসেন্স প্রাপ্ত রাইফেল রয়েছে । রাইফেল শুটার হিসেবে মন্দ নয় । অন্ততঃ দেড়শো দুশো গজের রেঞ্জ ও পাল্লা নিতে পারে । প্যাট্রিক ও রাইফেল চালাতে জানে । সঙ্গে আনে নি । আর এটাতো শিকার যাত্রা নয় । আমরা চলেছি ওই বাংলো গুলোর রিকনস্ট্রাকশনের টেন্ডার নিয়েছেন যিনি সেই রেভেঞ্জ রিকনস্ট্রাকশন গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত কর্তা মিঃ বিমান পালিতের বিশেষ আমন্ত্রণে । প্রকৃত অর্থে আমরা তাঁর অতিথি ও বন্ধু । আমরা অ্যাডভেঞ্চার করতে পছন্দ করি , এটা ওঁর অজানা নয় ।
বাংলো বাড়ি গুলোর মেরামতির কাজ দেখতে দেখতে অ্যাডভেঞ্চার করার অছিলায় রোমহর্ষক বৈচিত্র্যের স্বাদ নেওয়াও যাবে ।
কিন্তু সাইটের কাছাকাছি পৌঁছতে না পৌঁছতেই সন্ধে গড়িয়ে রাত নেমে গেল । নিস্তদ্ধ অরন্যের গভীর অন্ধকার থেকে বিচিত্র জীবজন্তুর ডাক ভেসে আসছে এমনভাবে যে একটা গা ছমছমে আবহ তৈরি হচ্ছে । বোলেরো হেড লাইটের আলোয় ওই বাংলো বাড়ি তিনটের হদিস করতে বাউন্ডারী ওয়াল ঘেঁষে রাস্তায় চলতে চলতে এন্ট্রান্স খুঁজতে গিয়ে প্রায় দিশাহারা ।
এ কেমন হলো । বাউন্ডারী ওয়াল দিয়ে ঘেরা মস্ত কম্পাউন্ডের রানিং কংক্রিটের স্ট্রাকচারের কোন জায়গায় এন্ট্রান্স নেই । আমাদের মনেহল কম্পাউন্ডের ভিতরে বড় বড় গাছপালার দুর্ভেদ্য অরন্য চিহ্ন দেখা গেলেও এবং ঘড়ির কাঁটা ঘুরে ঘুরে পাক খেতে থাকলেও প্রবেশের পথ বন্ধ বা প্রবেশপথহীন । অথচ গাছপালার মধ্যে ঠাহর করলে বাংলো বাড়ির চিহ্ন যেন নজরে ঠেকে ।
ইতিমধ্যে আমার বিমান পালিতের নাম্বার সেভ করা মোবাইল থেকে ওর নাম্বারে ক্রমাগত কানেক্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করে , লিজাকে পালিতের নাম্বার দিয়ে ট্রাই করতে বললাম ।
" নট রিচেবল্ ", লিজা ব্যর্থ মনোরথ হয়েহতাশভাবে বলল ।
রিসভ সাক্সেনা বলল , " গাড়ী স্টপ করে সমস্ত জানলার গ্লাস গুলো নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই । ফোনে কানেকশান পেলে আবার ট্রাই করতে হবে । "
" ও . কে. , অ্যাজ পার ইয়োর ওপিনিয়ন । "
আমরা যে এভাবে মহা ঘুমের অতলে তলিয়ে যাব কে জানতো বাবা । ভোরের আলো ভিতরে ঢুকতেই বাইরে তাকিয়ে আমরা তাজ্জব । আমরা একটা খালি মাঠের মতো জায়গায় হল্ট করে আছি !
No comments:
Post a Comment