তাপসকিরণ রায়
বর্ধমানে আমার এক জ্যাঠামশাই থাকতেন l আমি প্রায় প্রতিবছরই সেখানে ঘুরতে যেতাম l সেখানে আমি জ্যাঠতুতো ভাইবোনদের সঙ্গে মিলে মিশে যেতাম l তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি ।
আমরা গেলে জ্যাঠামশাই খুব খুশি হতেন l আনন্দ প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তার চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসত l তার ভালবাসার আবেগ আমাদের ছুঁয়ে যেত l
আমি প্রায়ই একটা জিনিস লক্ষ্য করতাম, রাতের নির্জনতায় জ্যাঠামশাই একলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন l মনে হত, ফিসফিস করে কারো সঙ্গে তিনি কথা বলতেন--মনে হত তিনি কিছু শুনতে পাচ্ছেন, সে সব শব্দের অর্থ কি তিনি খুঁজে ফিরতেন ? আবার আমাদের সামনে পেয়ে তিনি খুব খুশিও হতেন l
জ্যাঠামশাইয়ের বয়স হয়েছিল, আশির কাছাকাছি l এখনো তিনি উচ্ছল, প্রাণবন্ত, আবেগপ্রবণ আনন্দের মধ্যে কোন গভীরতা থেকে তার কান্না বেরিয়ে আসতো, অশ্রুধার কান্না ।
বয়স হলে মানুষ বুঝি অনেকটাই এমনি হয়ে যায় l কারো মধ্যে প্রকাশ বেশি, অনুভব আবেগ বেশি, অশ্রুত কান্নার ভিড় তাদের চোখে এসে জমে থাকে ।
একটা অদ্ভূত ভাবনার মধ্যে হাসি আনন্দের সঙ্গেই তার কান্নার উৎস ফুটে উঠত ! আসলে মানুষের বুঝি একটা বয়স থাকে তার সীমানায় এসে গণ্ডীবদ্ধ সে জানে আর বেশি দিন এই পৃথিবীতে সে নেই ! আর এ কারণেই বুঝি অন্য অজানা এক পৃথিবীকে সে আগেভাগেই চিনে নেবার চেষ্টা করে l তার পরিবেশকে বুঝে নিতে সার্থক অথবা ব্যর্থ চেষ্টায় অনুপ্রাণিত হয় l
প্রায় সময় জ্যাঠামশায়ের বাড়ী আমরা দু-তিনদিন থেকে আবার ফিরে আসতাম l জ্যাঠামশাই আমাদের নিয়ে বেশ হাসিখুশি থাকবেন l এমনি একবার আমরা ফিরে আসব, জ্যাঠামশাই অঝোরে কাঁদতে থাকলেন, বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, বাবারা কে জানে আর কোন দিন তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে কিনা !
জ্যাঠামশাই কথা বলতে পারছিলেন না, চোখের জলে সবাইকে দেখতে চাইলেন তিনি, সবার সঙ্গে কথা বলে তিনি সরে গেলেন--অপেক্ষমান খোলা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন l
বাইরের হাওয়া জানালা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল l অস্পষ্ট , ক্ষীণ শব্দ আসছিল, জ্যাঠামশাই সে শব্দ যেন কান পেতে শুনছিলেন l সে শব্দের বার্তার এক দিকে বেজে উঠছিল--যেতে নাহি দিব...অন্যদিকে যাবার নিশ্চিত একটা তাগিদ জ্যাঠামশাই স্পষ্ট যেন টের পাচ্ছিলেন l
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment