মানিকজোড়
সমাজ বসু
ছেলেদুটোর জ্বালায় অতিষ্ট রমা দেবী। বাড়িতে একাই থাকেন। ছোট্ট একটা বাগান লাগোয়া বাড়ি। ফুলের বড় শখ তাঁর। তার পেছনে তিনি অনেকখানি সময় ব্যায় করেন। ফলস্বরূপ বিভিন্নরকম ফুলে ভরে উঠেছে তাঁর বাগান। এছাড়া দুতিনটে পেয়ারা,আম আর বাতাবিলেবুর গাছও আছে। কিন্তু ওই বাঁদর দুটোর উৎপাতে গাছে না ফুল থাকে,না ফল। কখন যে ওগুলো নিয়ে পালায় টেরই পান না।
--- হ্যারে বাসন্তী,ওই বিচ্ছু ছেলেদুটোর কি করি বল তো?আজ এটা ভাঙছে,কাল ওটা ভাঙছে। ফুল ফল নিয়ে পালাচ্ছে। আমার হাড়মাস এক করে ছাড়ল।
--- দ্যাখো গিন্নিমা, আমার তো মনে হয় এবার তুমি পাড়ার কিছু বড়দের কানে কথাটা তোলো। তোমার পক্ষে ওদের শায়েস্তা করা সম্ভব নয়। তাই পূজোর পর দাদাবাবু এলে,এর একটা বিহিত করো।
--- হ্যা,এবার একটা কিছু করতেই হবে। এই তো কাল ভেবেছিলাম,আজ ঠাকুরকে একটা বাতাবিলেবু প্রসাদ দেবো। সকালে উঠে দেখি, চারটের একটাও নেই। মন খারাপ হয় কিনা বল? তুই ঠিকই বলেছিস,বাবলু এলে কিছু একটা করতে হবে।
আজ মহাষষ্ঠী। শরতের ঝকঝকে তকতকে আকাশ। বাতাস জুড়ে মায়ের আগমনীর সুরধ্বনি। এই মনোরম পরিবেশেও রমা দেবীর মন ভালো নেই। ছেলে ছুটি পায়নি। দশমীর আগে সে আসতেই পারবে না। এবার আর মায়ের মুখ দেখা হবে না। এইকটা দিন টিভিতেই দর্শন সেরে নিতে হবে। একটা কষ্ট তাঁর বুকে জাঁকিয়ে বসল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে এলো। পাড়ার পূজোমন্ডপ থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। বারান্দা থেকে বড় রাস্তায় লোকজনের যাওয়া আসা দেখতে দেখতে রমাদেবী পূজোর গন্ধ অনুভব করতে লাগলেন। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। পায়ে পায়ে নীচে নেমে এসে দরজা খুলতেই তিনি একেবারে অবাক। ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে কালু আর রঘু। মানিকজোড়।
--- একি! তোরা এখন? কেন এসেছিস? কি চাই তোদের?
--- আমাদের কিছু চাই না ঠাকুমা। কাকু তো বাড়িতে নেই। তাই আমরা এসেছি, তোমাকে পাড়ার ঠাকুরগুলো দেখাব বলে। একটা রিকশাও নিয়ে এসেছি। কালু আর রঘুর কথা শেষ না হতেই,রমাদেবীর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। তিনি পরম স্নেহে দুহাত দিয়ে দুজনকে কাছে টেনে নিলেন। সব কথা যেন তাঁর গলায় আটকে আছে।
--- নাও ঠাকুমা,এখন খুব তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নাও দেখি। আমরা নীচে অপেক্ষা করছি। কালুর কথা শেষ হতেই রঘু সুর ধরল।
--- ঠাকুমা,পূজোমন্ডপে কিন্তু আমাদের আইসক্রিম খাওয়াতে হবে।
--- শুধু আইসক্রিম কেন? আজ তোরা যা খেতে চাইবি,তাই খাওয়াব। ওরে,আমি যে তোদের চিনতে পারিনি। আজ থেকে তোরা দুই মানিকজোড় আমার দুচোখের দুটো মণি হয়ে গেলি। সঙ্গে সঙ্গে ওরা দুজন একসঙ্গে ঢিপ করে রমাদেবীকে প্রণাম সেরে নিল।
পাড়ার পূজোয় তখন মায়ের আমন্ত্রণ শুরু হয়ে গেছে। একসাথে অনেক ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে।
No comments:
Post a Comment