Sunday, 5 December 2021

মনোবেদনা তপন তরফদার

মনোবেদনা
তপন  তরফদার
 

অবশেষে আমার মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়েছে। ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছি, হোস্টেলেও ঘর  পেয়েছি। র‍্যাগিং পর্ব শেষ, এখন সবাই আমরা প্রাণের বন্ধু। অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে কোনো দ্বিধা নেই। সবাই মন খুলে আড্ডা মারি। ব্যতিক্রমী ওই  সুপ্তি গুপ্তা  এম.ডি. পড়ছে।  গম্ভীর মুখ  পরনে কালো ইঞ্চি পাড় সাদা শাড়ি সঙ্গে ধবধবে সাদা ব্লাউজ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। বছর পঁচিশের মেয়ে এরকম পোশাক নিয়ে নানা গালগল্প আমাদের মধ্যে চালু। গুপ্তাদি  কিন্তু  কাউকেই পাত্তা না দিয়ে  নিজের মত থাকে। একটা  অঘটন ঘটে গেল  তৃতীয় বৎসরের ছাত্রী মৌসুমী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। আমরা এমন কি ওর পরিজনবর্গ  শেষ দেখা দেখতে পায়নি। সবার মনেই দুঃখ এবং ক্ষোভ। আমাদের উপযুক্ত পোশাক পরিচ্ছদ  ছাড়াই পরিষেবা দিতে হচ্ছে।অনতিবিলম্বে এর প্রতিবিধান চাই। ঠিক হলো ওর স্মৃতি সভাতেই বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করা হবে। এই দুঃসময়ে আমরা সরব না হলে জনসাধারণ ভালো চোখে দেখবে না।

            সুপ্তিদিও এসেছেন মৌসুমীর শোক সভায়। যদিও শোক সভা,সভার শুরুতে গান পরিবেশনের রীতি আছে। গান কে গাইবে ঠিক করা হয়নি। সম্পাদক অনুরোধ করলো যদি কেউ এগিয়ে এসে গান  গেয়ে অনুষ্ঠান শুরু  করতে সাহায্য করে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুপ্তিদি  খালি গলায় গান  ধরলেন, “আমার প্রাণের পরে সে চলে গেল.......    বলে গেল না সে কোথায়  গেল  ফিরে এলো না” সভা নিস্তব্ধ শোকাহত। প্রত্যকেই অবাক এমন গান শুনে। সুপ্তিদি কিন্তু  কাউকেই কোনো আলাপনের সুযোগ না দিয়ে  নিজের ঘরে চলে গেলেন।

লকডাউন দুদিনের জন্য তুলে নেওয়া হয়েছে। হোস্টেল একদম ফাঁকা, সূর্যাস্ত শুরু  হয়ে গেছে। আমি ডাইনিং হলে এসে  দেখি চা হয়নি। সুপ্তিদি ও চা খেতে এসেছেন। এক লহমায় পরিস্থিতি বুঝে গিয়ে  নিজেই কিচেনে ঢুকে হিটার জ্বালিয়ে  ছোট্ট একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে জল ঢেলে  আমার দিকে তাকিয়ে বলে  তুই চা খাবিতো। আমার শরীরে এক শিহরণ।মাথা কাত করে বললাম, আমি সাহায্য করবো। সুপ্তিদি বলে কি এমন কাজ, তোর সাহায্য নিতে হবে। পাকা হাতের চা। টেবিলে বসে দুজনে চুমুক দিচ্ছি। হলঘর  শুনশান। সূর্য অনেক আগেই ডুবে গেছে, হস্টেলের আলো এখনো জ্বালানো হয়নি। একটা  রহস্যময় পরিবেশ। এই পরিবেশেই রহস্যময়ী আমার খোঁজ খবর নিল। আমি প্রশ্ন করার আগেই বলল, জানি আমাকে নিয়ে  তোদের অনেক  কৌতূহল। তোকেই বলবো, অন্য কাউকে  বলিসনা। ডিনার করে আমার ঘরে আসিস।

দরজায় টোকা মারতেই দরজা খুলে সুপ্তিদি আমাকে ধবধবে সাদা সাদা চাদর পাতা বিছানায় বসতে বলল। আলনায় একই ধরনের সাদা শাড়ি,সাদা এয়ারহোস্টেস ব্লাউজ। টেবিলের মাঝখানে এক যুবকের হাসিমুখের ছবি। ফটোর সামনে ফুলদানী তে সাদা ফুল। আমার  প্রেমিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আমরা অনেকের থেকে  প্রেমে এগিয়ে থাকতাম। বিয়ে না হলেও দুজনে “ওইক এন্ডে” বেড়াতে যেতাম। বুদ্ধপূর্ণিমায় শঙ্করপুরে গিয়ে ছিলাম। মধ্য যামিনীতে নির্জন উন্মুক্ত সমুদ্রতটে ফুলশয্যা করে বায়না ধরে ওই রূপো ঝরা জোৎস্নার ধারায় নির্মল সফেদ সমুদ্রের ফেনায় মৎস্যকন্যার সঙ্গে জলকেলি করবে। আমার  নিষেধাজ্ঞাকে ফুৎকারে উড়িয়ে আমাকে  পাঁজা কোলা করে ঢেউয়ের সামনে চলে আসলো। পূর্ণিমা রাতে তাজমহল দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে,তারাই উপলব্ধি করতে পারবে পূর্ণিমা রাতে শঙ্করপুরের সমুদ্র। মিনিট পাঁচেক হুটোপুটি করার পর  রাহুলকে দেখতে না পেয়ে  চিৎকার করতে থাকি রাহুল  রাহুল বলে। কোন  লাভ  হয়না। নোনতা বাতাসই সারাগায়ে ছুঁচালো হয়ে বিঁধতে থাকে। সমুদ্র ওকে ফেরত দেয় ঠিক দুদিন বাদে,সেই জায়গায়।

         সুপ্তিদি থামল, আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই লোডশেডিং হলো। সুপ্তিদির মুখটা অন্ধকারেই মিলিয়ে গেল। কান্নাভেজা কন্ঠের কথা, আমার  উচিত ছিল ওকে বাধা দেওয়ার। সরা জীবন ধরে  থেকেই যাবে আমার এই আপশোষ।

No comments:

Post a Comment

প্রাপ্তি--অদিতি ঘটক

প্রাপ্তি অদিতি ঘটক কেসটা সাজাতে গিয়ে বারবার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, অথচ হাতে সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি এফ. আই. আর. এর খসড়াটা  তৈরি করতে হবে। পরমার্...