শুভঙ্করী
বীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল
শোভন তোকে কতবার বলেছি শুভকে নিয়ে একবার পুরী ঘুরে আসতে। তুই কি আমার কথায় কান দিস না? আজকালকার ছেলেরা স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার জন্য প্রায় পাগল। কথাগুলি বলে শোভনের মা শকুন্তলা দেবী একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করলেন। শোভনের বিয়ে হয়েছে প্রায় সাত মাস এর উপর। শুভ আর শোভন একসাথে সেই অষ্টমঙ্গলা দিন তিন,চার ঘন্টার জন্য শ্বশুর বাড়িতে গিয়েছিল । তারপর থেকে স্বামী-শাশুড়ির সেবা ও সংসারের কাজ নিজেকে এমন ব্যস্ত করে ফেলল যে আর কোথাও যাওয়া হয়ে ওঠেনি। ছেলেটা বড় একগুঁয়ে আর বদমাশ তো। একশত বার বললাম যা বউকে নিয়ে পুরী জগন্নাথ দর্শন করে সমুদ্র কুলে কিছুদিন নিরালা ঘোরাঘুরি করে আয়। শকুন্তলা দেবী রাগে গজগজ করতে লাগলেন।
মুখে শেভিং ক্রিম লাগিয়ে শেভিং হচ্ছিল শোভন আর আড় চোখে শুভ কে লক্ষ্য করে দেখল মা ও ছেলের ঝগড়া বেশ উপভোগ করছে ।বুঝলে মা ব্যাংকে চাকরিতে ছুটি দেওয়া অত সহজ নয়। তুমি আমার ম্যানেজারকে বলে ছুটি নিয়ে আসো। এইতো বিয়ের সময় পনের দিন ছুটি নিলাম ।শকুন্তলা দেবী বললেন দেখ শোভন তোর ভাগ্য ভালো যে শুভর মত একটা মেয়ে তুই বউ হিসাবে পেয়েছিস। না, হলে আজকালকার মেয়েরা যা হয় এতদিন তোর আমার অবস্থা নাজেহাল করে দিত। শুভর মতো শান্ত মেয়ে সহজে মেলে না। সেই সুযোগে তুই যা ইচ্ছা তাই করবি। তোর বাবা ধর্মপরায়ন লোক ছিল বলে আজ আমরা তো ভালো আছি। না, হলে শুধু এমএ পাস করে ব্যাংকে এত ভালো চাকরি পেয়েছিস নাকি আর শুভর মত এমন শান্ত সুশীলা বউ। আজ লোকটা নেই থাকলে কত খুশি হত। এই বলে শকুন্তলা দেবী কান্না করে দিলেন সঙ্গে সঙ্গে শুভ এসে আঁচল দিয়ে শাশুড়ি মাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল মা কেঁদোনা। এতে আমাদের সবার অমঙ্গল হবে। শোভনের দিকে তাকিয়ে বলল দেখো ও কিছু একটা ব্যবস্থা করবে। এসব শুনে শোভন মনে মনে ভাবল দু চার দিনের ছুটির ব্যবস্থা করতেই হবে। শকুন্তলা দেবী বললেন নারে আর কাঁদবো না। উপরের দিকে হাত জোড় করে বললেন হে কালিয়া এই দুইজনকে যেন তোমার পদাশ্রিত করে রেখো। তুমি একমাত্র ভরসা।
শোভনের সময়টা বেশ ভালই চলছিল। ব্যাংকে ঢোকার সাথেসাথে বন্ধু অসিতের মুখোমুখি হয়ে গেল। শোভন বলল অসিত আমার চার দিনের ছুটি দরকার রথযাত্রা দেখতে পুরী যাব ।সেইসঙ্গে তোর বৌদিকেও রথযাত্রা ও পুরীর সমুদ্র দেখিয়ে আনব। অসিত একটু মুচকি হেসে বলল দে অ্যাপ্লিকেশন টা আমি ম্যানেজারকে বলে ছুটি মঞ্জুর করিয়া আনবো। শোভন ছুটির দরখাস্ত অসিত কে দিল ।কিছু সময় পরে অসিত ছুটি মঞ্জুর করে এনে দিয়ে বলল , ম্যানেজার তোর লীভ অ্যাপ্লিকেশন দেখে হাসছিল আর সঙ্গে সঙ্গে মঞ্জুর লিখে দিলো। অসিত আরও বলল পুরী হোটেলে আমার এক বন্ধু আছে ওকে বলে একটা ভালো রুম বুক করে দিচ্ছি। শোভনের আর আনন্দের সীমা থাকে না ঘরে ফিরে মা আর শুভকে এই কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে উঠল।
সোমবার রথযাত্রার তাই রবিবার দিন ওটিডিসি বাসে শুভ আর শোভন পুরী এসে পৌঁছালো। স্টেশন থেকে অটো রিক্সা করে পুরী হোটেল এর নির্দিষ্ট রুমে নিজেদের জিনিসপত্র নিয়ে উঠলো। জানালা খুলতেই বিশাল সমুদ্র ও তার ঢেউয়ের আনাগোনা দেখে দুজনেই আত্মহারা হয়ে গেল। বিকেলের দিকে জগন্নাথ মন্দিরে এসে মহাপ্রভুর দর্শন হয়ে গেল। সন্ধ্যায় সমুদ্র কোলে দুইজন হাত ধরাধরি করে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে দুজনের খুব ভালো লাগতে লাগলো। রাতে হোটেলে এর ডাইনিং রুমে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে দশটা নাগাদ দুজনে ঘুমিয়ে গেল। সকালবেলা প্রস্তুত হয়ে জগন্নাথের রথযাত্রা দেখব।
আজ সোমবার রথযাত্রা। তিন রথ তালধ্বজ দেবদলন ও নন্দীঘোষ,তিনি ঠাকুর বলদেব সুভদ্রা আর জগন্নাথ যে যার সামনে বসে বিশ্ববাসীকে এক সুন্দর রূপ থ অভয় প্রদান করছেন। সেবায়েত পান্ডারা কাঁসরঘন্টা ও বিবিধ ভগবানের ধ্বনিতে চারদিক মুখরিত। বড় দাণ্ড ও দুই পাশের ঘর বাড়ির ছাদে লোক লোকারণ্য। লক্ষ লক্ষ লোকের ধ্বনিতে আকাশ বাতাস কম্পিত। সেই সময়ে শুভ ও শোভন ঠাকুরের উদ্দেশ্যে প্রণাম করে রথের দিকে এগোতে লাগলো। হঠাৎ শোভনের মোবাইল বাজলে দেখল অসিতের ফোন বলল আমি একটা লোক পাঠিয়েছি ওর সংগে গিয়ে আমাদের এসবিআই এর বডশঙ্খ শাখায় ছাদের উপরে বসে ঠাকুর দেখবি। ওদের দু'শ টাকা দিবি। তাহলে আরাম করে রথযাত্রা দেখতে পারবি। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে এসে বলল এদিক দিয়ে আসুন আর ছাদের উপরে চলে যান বলে লোকটা নিমেষে অদৃশ্য হয়ে গেল।
শুভ আর শোভন কিছু জনসমাগম দাঁড়িয়ে দেখল অসংখ্য লোক ,ঘন্টা খোল কর্তাল হরিবোল ও উলুধ্বনির আওয়াজে চারদিক মুখরিত। যেন এক লোকজনের মহাসমুদ্র, সবার মুখে জগন্নাথ বলরাম সুভদ্রা জয় ধ্বনি।আকাশ বাতাস শব্দে মুখরিত ।স্বেচ্ছাসেবক দল পুলিশ যথাসাধ্য চেষ্টা করছে প্রবল জনসমাগম শৃঙ্খলিত রাখতে। এসব দেখে শুভর মন ঠাকুরের চিন্তায় বিভোর হয়ে গেল। যেন ঠাকুর তার উপরে ভর করেছে এক অভাবনীয় আনন্দের শিহরণে সমস্ত শরীর-মন আন্দোলিত হতে লাগলো। সকালে না খেয়ে আসাতে শরীর বেশ দুর্বল অনুভব করতে লাগলো। এমনি সময় ভীষণ জোরে জয় জগন্নাথ জয় বললাম জয় সুভদ্রা ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠলো ও লক্ষ লক্ষ জনতা দুই হাত উঁচু করে জয়ধ্বনী দিতে লাগলো । সেই সময় শুভ শোভনের হাত ছেড়ে দিয়ে দুই হাত উঁচু করে জয় জগন্নাথ জয় জগন্নাথ বলে চিৎকার করতে থাকলো। আর তখনই শোভন থেকে আলাদা হয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। প্রবল জনতার ভিড়ে শোভন আর শুভকে খুঁজে পেল না। শুভ জনতার ভিড়ে হারিয়ে গেল। মরিয়া হয়ে শোভন শুভ শুভ বলে যত চিৎকার করল কিন্তু শুভর কোন আওয়াজ আর পেলনা। জনতার ভিড়ে কখন সে নিজের জ্ঞান হারিয়ে অজ্ঞান অবস্থায় রইল সে আর কিছুই জানতে পারল না।
মুখে জলের ঝাপটায় শুভর জ্ঞান ফিরে ফিরে আসলো।
নিজেকে একটা ভাঙ্গা ঘরের ভিতরে আবিষ্কার করল।
চার পাচ জন অচেনা লোক তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে দেখে সে ঘাবড়ে গেল। মনে মনে ভাবল আমার সঙ্গে কিছু কি অঘটন ------------বলে নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসল।
ওদের ভিতর একজন বলে উঠল আরে না না তুই অজ্ঞান ছিলি এখন তোর জ্ঞান ফিরেছে। এখন তোর সাথে তোর সাথে কিছু হবে বলে শুভর একটা গাল টিপে একটা অশ্লীল ভাব দেখাল ।একথা শুনে শুভ্রর সারা দেহ-মন ঘৃণায় কেঁপে উঠলো একগাদা থুতু ছেলেটার মুখের উপর ছুড়ে ফেলে চিৎকার করে উঠলো। ছেলেটা শুভর মুখটা চেপে ধরে একটা চড় কসিয়ে দিল। শুভ কিছু উপায় না দেখে দুই হাত তুলে বলে উঠলো প্রভু জগন্নাথ আমাকে রক্ষা করো। ছেলেগুলি বলে উঠল তোকে আর রক্ষা করার কেউ নেই ।একজন ওর আঁচল ধরে টান মারলো। ভয়ে শুভ আবার অজ্ঞান হয়ে গেল।
দূর বহু দূর থেকে ভেসে এলো ওরে বাবারে মরে গেলাম রে আওয়াজ আর দুড়দাড় দৌডের শব্দ। কে যেন এলোপাথাড়ি লাঠির আঘাত করছে ছেলেগুলির মাথায় শরীরের যেখানে সেখানে। আধা সংজ্ঞাহীন অবস্থায় শুভ দেখতে পেল একটি কাল মূর্তি পুলিশ লাঠি দিয়ে ছেলেগুলোকে বেধড়ক মারছে আর ওরা ঊর্ধ্বশ্বাসে পালিয়ে গেল। কালো মূর্তি পুলিশ হঠাৎ শুভর একটা হাত ধরে টেনে তুলে বলল আয় মা তোকে তোর স্বামীর কাছে পৌঁছে দিয়ে আসি। শুভ যেন স্বপ্ন দেখছে। সেই অবস্থায় কোনো রকম শব্দ না করে পুলিশের সাথে অতিকষ্টে হাঁটতে লাগলো। তারা এসে সমুদ্র কুলের থানার সামনে দাঁড়ানো শোভনের কাছে থামল। শুভ দৌড়ে শোভনকে জাপ্টে ধরে হাউ হাউ করে কান্না করে দিয়ে তার বুকে আবার জ্ঞান হারালো।পুলিশটি তখন তার লাঠি হাতে অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল ।
শোভন সমুদ্রকুলের থানায় দেওয়া বউ নিখোঁজ ডায়েরি প্রত্যাহার করে তারা হোটেলে ফিরে এলো। জল ঝাপটা ও কিছু সেবা-শুশ্রূষার পর শুভ প্রকৃতিস্থ হলো আর সব কথা খুলে বলল। দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরে প্রবল কান্নার স্রোতে ভেসে যেতে লাগলো যেন দুজনে দুজনের থেকে অনন্ত কাল আর কখনো আলাদা হবে না।
চার দিন ছুটি ছিল। দুই দিনও হয়নি। জিনিসপত্র গুছিয়ে শুভ আর শোভন বাড়িতে ফিরে এলো। হঠাৎ ছেলে ও বউকে দেখে মা শকুন্তলা আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আরে এত শিগ্রি চলে এলি। আমাকে একটা ফোন করতে পারতিস। যাক বাঁচা গেল। কাল থেকে মনটা ভারি খারাপ। শুধু অমঙ্গল চিন্তা হচ্ছিল। কিন্তু আমি কালিয়া ঠাকুরকে সব সময় ডেকেছি ঠাকুর দুইজনের ভালোয় ভালোয় তোমার দর্শন হোক। যাক ভালো ভাবে ফিরে এসেছিস চিন্তা দূর হলো। শাশুড়ির কথা শুনে শুভ আর স্থির থাকতে পারলো না। তাকে জড়িয়ে ধরে কান্নার প্লাবন ভরিয়ে দিল। মা শকুন্তলা ছেলের দিকে তাকালে শোভন যা যা ঘটেছিল সব অকপটে বলে সেও কান্নায় ভেঙে পড়ল। সব শুনে শকুন্তলা দেবী পাথরের মত হয়ে গেলেন। কি কঠিন পরীক্ষা? বললেন হারে ঠাকুর মাঝে মাঝে আমাদের পরীক্ষা নেন কষ্ট সহ্য করার আর ছদ্মবেশে আমাদের নিকটই আসেন। সব সময় কালিয়া জগন্নাথ কে স্মরণ রাখবে। শুভ দেয়ালে টাঙ্গানো জগন্নাথ মূর্তিটির ভিতরে যেন জ্বলজ্বল ভাবে লাঠি হাতে পুলিশটি কে দেখতে পেল। দুই হাত জোড় করে নিঃশব্দে শুধু প্রণাম করতে পারল।
No comments:
Post a Comment