Tuesday, 7 December 2021

অনিকেত--মৌ দাশগুপ্ত

*অনিকেত*
মৌ দাশগুপ্ত

পারুলগ্রামকে অজ পাঁড়াগা বললেও অত্যুক্তি হয়না। যদিও প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনায় পাকা রাস্তা হয়েছে, বিদ্যুতের খুঁটি বসেছে। কেবল চ্যানেল আছে।তবু নেই এর তালিকাও ছোট নয়।

সেই পারুলগ্রামের সবেধন নীলমণি মেয়েদের জুনিয়রস্কুলে যখন দেবারতি অঙ্কের টিচার হিসাবে জয়েন করলো তখন ওর চেনাপরিচিতরা খুব একটা আশ্চর্য হয়নি।অন্তর্মুখী স্বভাবের দেবারতি মুখে কিছু না বললেও কম বয়সেই পিতৃহারা মেয়েটা পিঠোপিঠি ভাইয়ের আত্মহত্যা, মায়ের অকালমৃত্যু, প্রেমে ধোঁকা খাওয়া, বিয়ের বছর না ঘুরতেই ডিভোর্স সব মিলিয়ে আবাল্য চেনা শহর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়াটাই যে বেছে নেবে, এটা যেন সবারই জানা ছিল। নয়ত ফলিত গণিতে পিএইচডি করতে করতে সব ছেড়েছুড়ে ওই রকম কেরিয়ার বেছে নেওয়াটা ওর মত মেধাবী মেয়ের কাম্য থাকতে পারেনা। চাপা স্বভাব বলে স্কুল কলেজেও দু একজন ছাড়া কারো সাথে সেরকম বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি, পারিবারিক দুর্ঘটনার পর আত্মীয়দের সাথেও যোগাযোগ রাখত না বিশেষ, নিজের বলতে কেউই ছিলনা মেয়েটার তাই কোন পিছুটানও ছিল না।তবু পারুলগ্রামে আসার ছয়মাসের মধ্যে যে দেবারতি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে বসবে তা বোধহয় কেউ ভাবতেও পারেনি। মরার আগে ডায়েরীর খোলা পাতায় একটা চিঠি লিখে গেছিল,

আমার শহরে কোন কাঁটাতারের বেড়া নেই,তবু আমরা রোজরোজ সাবধানী পায়ে সীমান্ত মেপে নিই।

আমার ভাই যেদিন বলেছিল পাশের বাড়ির রাবেয়াকেই বিয়ে করবে,সন্ধ্যারতির প্রদীপ ফেলে মা মুঠোভরা ধুতরার বীজ দেখিয়ে বলেছিলেন দু'জনের কোন একজনকে বেছে নিতে।অথচ মা মরা পাশের বাড়ির রাবেয়াকে আমার মা যত্ন করে চুল বেঁধে দিতেন, রান্না শেখাতেন,ওর অক্ষরজ্ঞানও হয়েছিল আমার মায়ের হাতে, আমার পুরানো স্লেটে।বোকা ভাইটা দুজনকে বাদ দিয়ে রেললাইনকে নিজের ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল।সেদিন থেকেই দু'বাড়ির মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া উঠতে দেখেছিলাম। মা তারপরেও রাবেয়াকে দেখে চোখের জল ফেলতেন কিন্তু বেড়া ভাঙতে পারেননি।

মাকে হারিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলাম কুষানকে, সংসার পেতেছিলাম, কিন্তু আমার ভজনের সাথে ওদের ক্রিশমাশ ক্যারলের সুর মেলেনি। ওর পরিবার ওকে তাই ছিনিয়ে নিয়ে গেল নিষিদ্ধ চৌকাঠ ডিঙানোর দায়ে।সেদিনও আরেক কাঁটাতারের বেড়া উঠতে দেখেছিলাম। রাস্তায় দেখা হয় দুজনের, আমরা হাসি, কথা না বলে এড়িয়ে যাই পরস্পরকে, বেড়া কিন্তু ভাঙে নি।


মনে মনে মেপে নিই নিজের বদলে যাওয়া চাহিদা,মাকে মনে পড়ে, ভাইকে, রাবেয়া, আর কুষাণকেও, আমার সেই চারদেওয়ালের ঘরকে। কিন্তু চোখ ফিরালেই চারপাশে নানা মাপের কাঁটাতার বেড়া,আমি যে আর বাড়ি ফেরার পথ খুঁজে পাইনা।"


স্কুলের নথি খুঁজে পাওয়া ঠিকানায় খবর গেছিল, ফাঁকা বাড়ি, কেউ থাকেনা, কি ভেবে তাও কদিন মর্গে শবদেহ রেখে দিয়েছিলেন থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার। যদিও বেশিদিন রাখতে হয়নি। তিনদিনের মাথায় দেবারতি ব্যানার্জি নামের ট্যাগ লাগানো বরফে শোয়ানো দেহটার সাথে চিঠিটাও তুলে দিয়েছিলেন শেষকৃত্য করতে আসা মেয়েটির হাতে, যে নিজের নাম বলেছিল রাবেয়া দেবাশীষ ব্যানার্জি।

No comments:

Post a Comment

প্রাপ্তি--অদিতি ঘটক

প্রাপ্তি অদিতি ঘটক কেসটা সাজাতে গিয়ে বারবার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, অথচ হাতে সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি এফ. আই. আর. এর খসড়াটা  তৈরি করতে হবে। পরমার্...