Saturday, 4 December 2021

ছায়াঢাকা বাড়ি--রবীন বসু


ছায়াঢাকা বাড়ি

 ( গল্প )

 রবীন বসু


রোজ কোচিংয়ে যাওয়া আসার পথে বাড়িটাকে দেখে শরণ্য। কেমন ছায়াঢাকা ভূতুড়ে । পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বড় একতলা বাড়ি। সামনে পেছনে বাগান। বড় বড় প্রাচীন গাছ। কত পাখি আসে বিভিন্ন ঋতুতে।  বিচিত্র তাদের ডাক। কলকাতার মধ্যে এমন পাখিডাকা বাগান আছে, তা না দেখলে বিশ্বাসই হবে না।  এলাকার সব কিশোর-কিশোরীর আগ্রহ এই ছায়াঢাকা রহস্যঘন বাড়ি। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছে এ বাড়ি সম্বন্ধে। লোকমুখে মৌচাক বাড়ি। আসলে বাড়ির যিনি মালিক সত্যব্রত চৌধুরী 'মৌচাক' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। অবসর নিয়েছেন। পত্রিকা এখন একমাত্র ছেলে সুবিনয়ের দায়িত্বে। সে তার পরিবার নিয়ে থাকে সল্টলেক। সহকারী বিলাসকে উঃ শহর দক্ষিণ কলকাতার কসবা অঞ্চলে এতবড় বাড়িতে একা থাকেন সত্যব্রত চৌধুরী। বিলাস উড়িষ্যার লোক। খুব বিশ্বস্ত। 

শরণ্যর কৌতূহলের কারণ অবশ্য অন্য। তাদের বাড়িতে খবরের কাগজের সঙ্গে মাসিক মৌচাক পত্রিকা আসে। মা,কাকিমা আর অন্যান্য ভাইবোনদের সঙ্গে সেও পড়ে। বাবা বলেন, 'পড়ার বইয়ের সঙ্গে গল্পের বই ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকা পড়লে শিশু-কিশোরদের কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে আর চরিত্র গড়ে ওঠে।'

মৌচাক পত্রিকাটি সত্যি খুব সুন্দর । কত ছড়া, গল্প আর অ্যাডভেঞ্চারে ভরা থাকে। অপূর্ব সব ছবি। শরণ্য পড়ার ফাঁকে ফাঁকে গোগ্রাসে গেলে। তার মনে হয় সেও অমন লিখবে। কত ভাবনা, কত ছবি মনে ভাসে। একটা খাতা আলাদা করে রেখেছে লুকিয়ে। সেটাতে সে ছুটির দিনে কবিতা ছড়া লিখে রাখে। গত বছর তার একটা ছড়া ইস্কুল ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়েছে। শরণ্য ভাবে একদিন মৌচাক বাড়িতে যাবে। সম্পাদক মহাশয়কে সামনাসামনি দেখার কৌতূহল । তার উপর আর একটা গোপন ইচ্ছাও ছিল ‌। তার লেখাগুলো দেখানো। সাহসে কুলায় নি। যদি বকে দেন। কিংবা বিরক্ত হন। কখনো বা বুকে একটু সাহস এনে ভাবে, যা হয় হোক। একবার যাবেই। 

হাফইয়ার্লি পরীক্ষা শেষ হতেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রীতমের বাড়িতে গেল শরণ্য। 'তোকে একটা কথা বলব, বল্ না করবি না!'

'কী কথা, বল্ ।' প্রীতম জানতে চায়।

'আমার সঙ্গে মৌচাক বাড়িতে যাবি?'

'মৌচাক বাড়ি ! না বাবা। ভয় করছে।'

'ভয়ের কী আছে! উনি বাঘ না ডাকাত ! আমরা যাব, আমার লেখার খাতাটা দেখাব। চলে আসব। প্লিজ চ'।' 

প্রীতম প্রিয় বন্ধুর অনুরোধ ফেলতে পারল না। আবার মনের কোণের ভয়টাও থেকে গেল। নিমরাজি হয়ে বলল, 'ঠিক আছে যাব তোর সাথে।'

শরণ্য হাতে চাঁদ পেল। পরের রবিবার সকালে টিফিন খাওয়ার পর লেখার খাতাটা জামার মধ্যে লুকিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল । প্রীতমকে রথতলা মোড়ে দাঁড়াতে বলেছিল। ওকে নিয়ে যখন মৌচাক বাড়ির গেটে গেল তখন বেলা প্রায় দশটা। অক্টোবর মাস। পুজো সামনে। বাগানে শিউলি ফুল ফুটেছে। মিষ্টি গন্ধ। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক উঁকিঝুঁকি মারার পর সাহস করে গেটে ধাক্কা দিল। বাগানের লন পার হয়ে মাঝবয়সি বিলাস এগিয়ে এল। ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, 'কী চাই, খোকাবাবুরা?'

শরণ্য বলল, 'আমরা এসেছি সম্পাদক মশাইয়ের সাথে দেখা করতে।'

'কারণ!'

'কারণ কিছু না। আমার লেখা ওঁনাকে দেখাব।' 

'এসো তোমরা।'

বিলাস গেট খুলে দিল। ওকে ফলো করে ওরা বাগান পেরিয়ে বড় বসার ঘরে গিয়ে ঢুকল। সাদা চুল সৌম্য এক বৃদ্ধ ইজিচেয়ারে বসে বই পড়ছেন। এত বড় বসার ঘর এর আগে শরণ্য দ্যাখেনি। দেয়ালে যামিনী রায়, নন্দলাল বসুর বড় বড় ছবি। আলমারিতে বই ঠাসা। টিভি আছে। একপাশে সোফা আর অনেকগুলো কৌচ। তাদের পায়ের শব্দে ভদ্রলোক মুখ তুললেন। বিলাস বলল, 'বাবু, এরা এ পাড়ার ছেলে। আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।'

চোখে আগ্রহ এনে সত্যব্রতবাবু বললেন, 'তাই নাকি! তোমাদের নাম?'

শরণ্য আর প্রীতম নিজেদের নাম বলল। ভদ্রলোক এবার জানতে চাইলেন, 'তোমরা কোন ইস্কুলে, কোন ক্লাসে পড়?'

'আমরা এবার মাধ্যমিক দেব।' এরপর শরণ্য তাদের ইস্কুলের নাম বলল।

'বেশ, বেশ। তোমরা আমাদের পত্রিকা পড়? সাহিত্য ভালোবাসো?'

দুই বন্ধু ঘাড় নাড়ে। এবার সত্যব্রতবাবু বিলাসের দিকে চেয়ে বলেন, 'খোকাবাবুদের কিছু খেতে দাও।'

বিলাস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল খাবার আনতে। শরণ্য পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সম্পাদক মহাশয়ের সামনে।  তার লেখার খাতাটা ওঁনার দিকে বাড়িয়ে দিল। খাতাটা নিয়ে পাতা উলটে পড়লেন। 

'তোমার হাতের লেখা তো দেখছি চমৎকার। এখনকার ছেলেমেয়েদের হাতের লেখা তেমন ভালো হয়না। কিন্তু লেখক হতে গেলে হাতের লেখা সুন্দর হওয়া চাই‌। যাতে সম্পাদক মহাশয় তোমার লেখাটা আগ্রহ নিয়ে পড়েন। তুমি হাতের লেখায় পাশ করেছ। তবে, সব লেখা ভাল হয়নি। কিছু ভাল।'

তারপর খাতাটা শরণ্যর হাতে দিয়ে বললেন, 'এই যে ছড়া দুটো আমি টিক মেরে দিয়েছি, ওখানে টেবিলে দেখো প্যাডের কাগজ আছে, ভালো করে কপি করে দাও‌। লেখার শেষে ঠিকানা, বাবার নাম ও বাড়ির টেলিফোন নম্বর লিখবে।'

শরণ্য বাধ্য ছেলের মত কথা শুনল। লেখা কপি করে ওঁনার হাতে দিতেই বিলাস খাবার নিয়ে ঢুকল। খাওয়া শেষ হতে শরণ্য আর প্রীতম ওঁনার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

'তোমরা গুড বয়‌। আজ তাহলে এসো। তবে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার রায় আর সত্যজিৎ পড়বে। তাহলে বড় হয়ে আরও ভাল লিখতে পারবে।' সেদিন মনে বেশ আনন্দ আর উৎসাহ নিয়ে বাড়ি ফিরল শরণ্য। 

মাস খানেক পর ইস্কুল থেকে ফিরে পড়ার ঘরে টেবিলে দেখল মৌচাক পত্রিকা। ডাকে এসেছে। তার নামে। প্রযত্নে বাবার নাম। শরণ্যর বুকটা ঢিপ করে উঠল। এক আকুল আগ্রহে সে পত্রিকার মোড়ক খুলে ফেলল।  সূচিপত্রে তার চোখ আটকে গেল। ছড়া/কবিতা বিভাগে তার 'শরৎরানি' ছড়াটি ছাপা হয়েছে। পত্রিকা হাতে একছুটে মায়ের ঘরে। বাবাও সেখানে ছিলেন। 

'এই দেখো, আমার লেখা ছাপা হয়েছে।' শরণ্য উৎফুল্ল। 

অন্যান্য ভাইবোনেরাও সব ঘরে এসে গেছে। মা হাসি মুখে পত্রিকাটা নিয়ে জোরে জোরে পড়ে শোনাল। সব্বাই হাততালি দিল। বাবা শুধু বললেন, 'তাহলে এবার আমাদের বাড়িটা লেখকবাড়ি হল।'

শরণ্যর চোখে ভাসছে শুধু সেই ছায়াঢাকা বাড়ি আর তার সৌম্য শুভ্রকেশ সম্পাদকের মুখ।

                         ••

No comments:

Post a Comment

প্রাপ্তি--অদিতি ঘটক

প্রাপ্তি অদিতি ঘটক কেসটা সাজাতে গিয়ে বারবার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, অথচ হাতে সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি এফ. আই. আর. এর খসড়াটা  তৈরি করতে হবে। পরমার্...