সন্ধ্যা রায়
অনেকেই বলে মনে কখনো অহংকার এলে একবার শ্মশানে ঘুরে আসবেন l আমার মনে হয় একবার হাসপাতালে যাওয়া সব চাইতে ভালো l ওখানে গেলে জীবনকে চেনা যায়, এখন ভালো আছি, কাল কি হবে? তা কেউ জানে না l সামনে নানা অনুভূতির জন্ম হয় যা নিজের চোখে দেখা যায়। নানা বিস্ময়কর অনুভূতির সমন্বয় ঘটে । --চলুন ম্যাডাম, আমি ধরে উঠিয়ে দিচ্ছি, বসুন হুইল চেয়ারে, আপনাকে এক্স-রে করাতে নিয়ে যেতে হবে--
নার্সের সাহায্য নিয়ে আমিও উঠে বসলাম, চললাম নার্সের সাথে, ভেতরে পৌঁছে দাঁড়িয়ে আছি। আমার আগের জনের এক্সরে হচ্ছে, তারপরই আমার চান্স । হঠাৎ এক ইমারজেন্সি পেশেন্ট এলো, তার নাকে নল, মুখে ব্যান্ডেজ, ইউরিনের টিউব-প্যাক্ লাগানো l মনে হল তার প্রাণটা নিমেষে উড়ে যেতে পারে, সব শেষ হয়ে যেতে পারে l দেখেই কেমন ভয় হচ্ছিল, ঠাকুর সবাইকে ভাল করে দিও--আমি দুহাত তুলে প্রার্থনা করলাম l একটা পঁচিশ ত্রিশ বছর বয়সের ছেলে, ওর জীবনের সব পড়ে আছে, আমার তো সব শেষ করে এসেছি, ইমারজেন্সি পেশেন্টের এক্সরে আগে নেওয়া হল l তারপর আমার সময় আসবে l
এক্স-রের পরে আমি আমার নিজস্ব হসপিটালের ঘরটিতে চলে এলাম l এই সব দেখে আমি বড় ক্লান্ত, খাওয়া হল, আবার ড্রিপ চলল l আমি ঘুমিয়ে নিয়ে শান্ত হলাম l বিকেলে আবার আলট্রা সাউন্ড এর জন্য গেলাম l ওখানে কোন ভিড় নেই, আমার কি হয়েছে তখনও আমি জানি না l, আমার আল্ট্রাসাউন্ড চলাকালীন তা গুটিকতক স্টুডেন্টকে দেখানো হল l ডক্টর তাদের সামনে খুব শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা করলেন হিন্দিতে আর ইংরেজিতে , তার এসব এখানে কিছু আমি দিলাম না l পরদিন আবার অন্য একজন নার্স তার সঙ্গে গেলাম সিটিস্ক্যান করাতে l অন্য দিনের মতই দাঁড়িয়ে আছি, কারো সিটিস্ক্যান চলছিল, সে বেরোলেই আমি যাব l ওখানে এক সুন্দরী মেয়ে, বছর পনের ষোলর হবে, ওর কি রোগ ছিল আমি জানি না l আমাকে দেখেই মেয়েটি আমার পাশে এল, জিজ্ঞাসা করল, তোমার কি হয়েছে গো ? আমি বললাম, জানি না কি হয়েছে l আমার আসলে এতকিছু বলার ক্ষমতাও ছিল না l আমি তাই এড়িয়ে গেলাম l আমাকে ও বলল, তুমি ভালো হয়ে যাও! আমার মার তো ক্যান্সার হয়েছিল, মারা গিয়েছে l আমি ওখানে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলাম l এত কষ্ট মেয়েটার! কি জানি কি হয়েছে !
আমি ভিতরে গেলাম, তারপর পঁয়ষট্টি বছর বয়সে আমার প্রথম সিটিস্ক্যান হল l আবার হসপিটালের নিজের রুমে চলে গেলাম l কিন্তু মনে হতে থাকলো, মেয়েটার মার ক্যান্সার ছিল , আমারও বায়োপসির জন্য গেছে, কি রিপোর্ট আসবে কে জানে? কখন যেন ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম l হাসপাতালের তাড়নায় ঘুম কিন্তু ভালই হয় l পরদিন রিপোর্ট বোধহয় এসে গিয়ে ছিল, সকাল থেকে জল খেতে দেয়নি, নিয়ে গেল ওটিতে l ওখানে গিয়ে দেখি এক সাড়ে তিন বছরের শিশু ওর সামনে টয়ট্রেন সাজানো l বেডের উপর খেলছে সে l মনে হল এই বাচ্চাটা এল কেন এখানে ? নার্সকে জিজ্ঞাসা করতেই বললো, ওর ব্রেন টিউমার l মনে মনে আমি , অবাক হলাম, এত ছোট বাচ্চার ব্রেইন টিউমার হয়? তখন আমার মনে সারদা মা ও ঠাকুরের মুখটা ভেসে উঠলো l
--তুমি তো আমাকে অনেক সুখ দিয়েছো, মা ! আমি পঁয়ষট্টি, এসেছি এই হাসপাতালে, এত ছোট বাচ্চার কি অপরাধ মা, কেন এমনি হল ! আমার চোখ থেকে জল বেরিয়ে এলো l আমি তাকিয়ে দেখি, শিশুটা অপলক তাকিয়ে আছে আমার দিকে l আমি নিজেকে সংবরণ করে একটা হাসি দিলাম--মায়ের উদ্দেশ্যে হাত উঁচু করে বারবার প্রণাম করলাম l বললাম, ভালো করে দাও এই শিশুটাকে--
আমি তো বয়সে বুড়ো হয়ে এসেছি আমি নিজের সব কষ্ট ভুলে যাব মা, ওকে ভালো করে দিও তুমি! যেন এই পৃথিবীর আলো বহুদিন সে দেখতে পায় l
এম.আর.আই. হল l ভিড় নেই একদম--এক ঘন্টার উপরে সময় লাগলো l আজ আর মনকে নাড়া দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা নেই l ফিরছি রুমের দিকে, হঠাৎ কান্নার আওয়াজ এলো l সামনে দিয়ে, স্ট্রেচারে একজন ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে--দু জন স্ত্রীলোক একজন পুরুষ লোক কান্নায় ভেঙে পড়েছে l বুঝলাম, ছেলেটি মারা গেছে, মুখটা তার তখনও সাদা কাপড়ে ঢাকা হয়নি l মা বাবা আর স্ত্রী শেষ দেখার জন্য সুযোগ পেয়েছে l আন্দাজেই আমি বুঝে নিয়েছিলাম l আমি জানি না বা চিনি না--তবুও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম মৃতদেহ দেখে l নার্সকে বললাম, একটু , দাঁড়াও , আমি দুহাত তুলে প্রণাম করলাম মৃতের উদ্দেশ্যে--খুব সুন্দর ছেলেটাকে দেখতে l দেখে মনে হল যেন শ্রী নারায়ণ সমুদ্র শয়ানে l আমার নিজের প্রতি ঘৃনা হল, আমি নিজের জন্য কাঁদি তার চেয়ে এই সব ছেলেদের আরও প্রাণ দিও, ঠাকুর, জীবনী শক্তি তাদের মধ্যে আরও দাও ঠাকুর ! এইসব প্রাণকে রক্ষা করো, আরো অনেক অনেক দিন এদের সময় দিও! কিছুই হয়নি জীবনে তার, হয়ত মাত্র শুরু করেছিল, এখানেই শেষ করে দিও না ঠাকুর l
সমাপ্ত
অভিজ্ঞতা তারতম্য তো থাকবেই l হাসপাতালগুলো আমাদের জীবনের বাস্তব পরিস্থিতিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে পারে--দুঃখগুলো কত গভীর ও বেদনাদায়ক হতে পারে হাসপাতালের পরিদৃশ্য গুলো থেকে আমরা সহজে অনুভব করতে পারি l আর দুঃখ-বেদনার মধ্যে এসেই আমাদের আরাধ্য দেবতা কিংবা ভগবানকে স্মরণ করার মানসিকতা খুঁজে পাই l এর ই নজির হিসাবে এ গল্পটি সার্থক চিত্রণ বলা যায় l
ReplyDeleteসন্ধ্যা প্রার্থনা কবিতাটি খুব ভাল লাগলো।
ReplyDelete