Sunday, 5 December 2021

তনুশ্রী গুহ--" বন্ধুত্ব নাকি ভালোবাসা"



তনুশ্রী গুহ--"বন্ধুত্ব নাকি ভালোবাসা"

--তনুশ্রী গুহ

আজ রাহুলের ইউনিভার্সিটি-র ক্লাসের শেষ দিন। ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পর বাড়িতে বসে একটু ফেসবুক করছে রাহুল। চোখ পড়লো রাহুলের একটি মেয়ের প্রোফাইলে। যার নাম শ্রেয়া। রাহুলের খুব ভালো লাগলো সেই শ্রেয়া মেয়েটিকে দেখে। রাহুল ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো শ্রেয়াকে। তারপর সারাক্ষণ রাহুল শুধু শ্রেয়ার কথাই ভাবতে লাগলো। রাহুল খুব ভালো গান করে। মনে মনে শ্রেয়াকে কল্পনা করে সে গান করতে লাগলো এবং ভাবতে লাগলো যাকে সে চেনেনা, জানেনা তার জন্য আজ তার মন এতো ছটফট করছে কেনো! কি আছে শ্রেয়ার মধ্যে! এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেলো। রাহুল, শ্রেয়ার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্টের অপেক্ষায় রইলো। দুসপ্তাহ পর শ্রেয়া, রাহুলের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলো। তারপর আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। শ্রেয়া, রাহুলের মধ্যে এক ভালো সম্পর্ক শুরু হল। দুজন দুজনের খুব কেয়ার করা শুরু করলো। এখনো কেউ কাউকে সামনা সামনি দেখেনি। এরপর দুজন দুজনের সাথে দেখা করার দিন ঠিক করলো। এরপর দুজনের একদিন দেখা হল। রাহুল, শ্রেয়াকে দেখে যেন চোখ সরাতে পারছিলোনা। এতোটা বেশি মন থেকে সে ভালোবেসে ফেলেছিলো শ্রেয়াকে। রাহুল খুব সরল ও সাদাসিধা ছেলে তাই খুব সাদাসিধা ভাবেই সে শ্রেয়ার সাথে দেখা করতে আসে। আর ওদিকে শ্রেয়া সাজতে খুব ভালোবাসে, ওর কাছে বাইরের লুকস -ই যেন সবকিছু। যাইহোক রাহুলকে সামনা সামনি দেখে এবং রাহুলের সাদাসিধা লুকস শ্রেয়ার ভালো লাগলোনা। কিন্তু সেটা সে রাহুলকে বুঝতে দিলোনা। দুজন দুজনের সাথে সেদিন দেখা করার পর রাহুল, শ্রেয়াকে বললো যে সে শ্রেয়াকে এখন আর শুধু বন্ধু মনে করেনা বরং তার জীবনসঙ্গী মনে করে। শ্রেয়া এটা শুনে একটা মুচকি হাসি দিলো। এরপর পরের দিন রাহুল, শ্রেয়াকে ফোন, এসএমএস করে কিন্তু শ্রেয়া, রাহুলকে ইগনোর করা শুরু করে। তারপর রাহুল, কারণ জানতে চাওয়ায় শ্রেয়া, রাহুলকে বলে, "আমরা ভালো বন্ধু, এর বেশি আর কিছুনা। আমি খুব তাড়াতাড়ি কোনো স্টাইলিশ সুন্দর ছেলেকে বিয়ে করবো"। রাহুল, কারণটা বুঝতে পারে এবং রাহুল খুব কষ্ট পায়। তারপর শ্রেয়ার বিয়ে ঠিক হয় অন্য একজনের সাথে। রাহুল, শ্রেয়ার কাছে গিয়ে খুব কান্নাকাটি করে। শ্রেয়া তখন রাহুলকে বলে, " তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসো তাহলে আমার জীবন থেকে দূরে চলে যাও"। রাহুল খুব কষ্ট পায় এবং সেখান থেকে চলে যায়। এরপর শ্রেয়ার অন্যজনের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের ছ মাসের মধ্যে শ্রেয়া জানতে পারে যে শ্রেয়ার বর একজন ঠকবাজ মানুষ এবং সে আগে বিয়ে করেছে, এবং যত দিন যায় সে শ্রেয়ার ওপর অত্যাচার শুরু করে। এই অত্যাচার গুলো সহ্য করতে আর পারছিলোনা শ্রেয়া। বাধ্য হয়ে সে তার বাবার বাড়িতে চলে যায় এবং সব বলে। কিন্তু তার বাড়ি থেকে তাকে বলে শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য এবং অ্যাডজাস্টমেন্ট করার জন্য। দিন দিন শ্রেয়ার ওপর তার বরের অত্যাচার বাড়তে থাকে এবং শ্রেয়ার জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। আর এদিকে রাহুল জীবন সংগ্রাম, কষ্ট করে আজ একজন প্রতিষ্ঠিত গায়ক। আর রাহুলের লুকস এখন আর চেনাই যায়না, মেয়ে ফ্যান ফলোয়িং ভর্তি এখন রাহুলের। কিন্তু রাহুল এখনো শ্রেয়াকেই ভালোবাসে। কারণ সে যে মন থেকে ভালোবেসেছিলো শ্রেয়াকে। অবশেষে শ্রেয়া আর এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। কোথায় যাবে সে জানে না, কিন্তু আজ যেন সে নিজের সেই ভুল বুঝতে পারছে যা সে রাহুলের সাথে করেছিলো। শ্রেয়া, রাহুলের কাছে গেলো। রাহুলের কাছে ক্ষমা চাইলো শ্রেয়া এবং বললো যে তার জীবনে এখন আর কিছু নেই, তাই সে আর কি করবে এখন কোনো আশ্রমে গিয়ে থাকবে। এই বলে শ্রেয়া যখন সেখান থেকে চলে যাচ্ছিলো তখন রাহুল, শ্রেয়ার হাত ধরে বললো, "শ্রেয়া, আমি আজও শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। আমি থাকতে তুমি কোথাও যাবেনা। আমি জানিনা আমাদের সম্পর্কটা তোমার কাছে এখনো বন্ধুত্ব নাকি ভালোবাসা, কিন্তু আমার কাছে তুমি আমার সবকিছু"। এটি শুনে শ্রেয়া কেঁদে ফেললো এবং রাহুলকে জড়িয়ে ধরলো। এরপর শ্রেয়ার তার বরের সাথে ডিভোর্স হয়। আজ রাহুল আর শ্রেয়ার বিয়ে। রাহুলের সত্যিকারের ভালোবাসা ও অপেক্ষা অবশেষে জয়ী হল।।

মনোবেদনা তপন তরফদার

মনোবেদনা
তপন  তরফদার
 

অবশেষে আমার মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়েছে। ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছি, হোস্টেলেও ঘর  পেয়েছি। র‍্যাগিং পর্ব শেষ, এখন সবাই আমরা প্রাণের বন্ধু। অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে কোনো দ্বিধা নেই। সবাই মন খুলে আড্ডা মারি। ব্যতিক্রমী ওই  সুপ্তি গুপ্তা  এম.ডি. পড়ছে।  গম্ভীর মুখ  পরনে কালো ইঞ্চি পাড় সাদা শাড়ি সঙ্গে ধবধবে সাদা ব্লাউজ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। বছর পঁচিশের মেয়ে এরকম পোশাক নিয়ে নানা গালগল্প আমাদের মধ্যে চালু। গুপ্তাদি  কিন্তু  কাউকেই পাত্তা না দিয়ে  নিজের মত থাকে। একটা  অঘটন ঘটে গেল  তৃতীয় বৎসরের ছাত্রী মৌসুমী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। আমরা এমন কি ওর পরিজনবর্গ  শেষ দেখা দেখতে পায়নি। সবার মনেই দুঃখ এবং ক্ষোভ। আমাদের উপযুক্ত পোশাক পরিচ্ছদ  ছাড়াই পরিষেবা দিতে হচ্ছে।অনতিবিলম্বে এর প্রতিবিধান চাই। ঠিক হলো ওর স্মৃতি সভাতেই বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করা হবে। এই দুঃসময়ে আমরা সরব না হলে জনসাধারণ ভালো চোখে দেখবে না।

            সুপ্তিদিও এসেছেন মৌসুমীর শোক সভায়। যদিও শোক সভা,সভার শুরুতে গান পরিবেশনের রীতি আছে। গান কে গাইবে ঠিক করা হয়নি। সম্পাদক অনুরোধ করলো যদি কেউ এগিয়ে এসে গান  গেয়ে অনুষ্ঠান শুরু  করতে সাহায্য করে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুপ্তিদি  খালি গলায় গান  ধরলেন, “আমার প্রাণের পরে সে চলে গেল.......    বলে গেল না সে কোথায়  গেল  ফিরে এলো না” সভা নিস্তব্ধ শোকাহত। প্রত্যকেই অবাক এমন গান শুনে। সুপ্তিদি কিন্তু  কাউকেই কোনো আলাপনের সুযোগ না দিয়ে  নিজের ঘরে চলে গেলেন।

লকডাউন দুদিনের জন্য তুলে নেওয়া হয়েছে। হোস্টেল একদম ফাঁকা, সূর্যাস্ত শুরু  হয়ে গেছে। আমি ডাইনিং হলে এসে  দেখি চা হয়নি। সুপ্তিদি ও চা খেতে এসেছেন। এক লহমায় পরিস্থিতি বুঝে গিয়ে  নিজেই কিচেনে ঢুকে হিটার জ্বালিয়ে  ছোট্ট একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে জল ঢেলে  আমার দিকে তাকিয়ে বলে  তুই চা খাবিতো। আমার শরীরে এক শিহরণ।মাথা কাত করে বললাম, আমি সাহায্য করবো। সুপ্তিদি বলে কি এমন কাজ, তোর সাহায্য নিতে হবে। পাকা হাতের চা। টেবিলে বসে দুজনে চুমুক দিচ্ছি। হলঘর  শুনশান। সূর্য অনেক আগেই ডুবে গেছে, হস্টেলের আলো এখনো জ্বালানো হয়নি। একটা  রহস্যময় পরিবেশ। এই পরিবেশেই রহস্যময়ী আমার খোঁজ খবর নিল। আমি প্রশ্ন করার আগেই বলল, জানি আমাকে নিয়ে  তোদের অনেক  কৌতূহল। তোকেই বলবো, অন্য কাউকে  বলিসনা। ডিনার করে আমার ঘরে আসিস।

দরজায় টোকা মারতেই দরজা খুলে সুপ্তিদি আমাকে ধবধবে সাদা সাদা চাদর পাতা বিছানায় বসতে বলল। আলনায় একই ধরনের সাদা শাড়ি,সাদা এয়ারহোস্টেস ব্লাউজ। টেবিলের মাঝখানে এক যুবকের হাসিমুখের ছবি। ফটোর সামনে ফুলদানী তে সাদা ফুল। আমার  প্রেমিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আমরা অনেকের থেকে  প্রেমে এগিয়ে থাকতাম। বিয়ে না হলেও দুজনে “ওইক এন্ডে” বেড়াতে যেতাম। বুদ্ধপূর্ণিমায় শঙ্করপুরে গিয়ে ছিলাম। মধ্য যামিনীতে নির্জন উন্মুক্ত সমুদ্রতটে ফুলশয্যা করে বায়না ধরে ওই রূপো ঝরা জোৎস্নার ধারায় নির্মল সফেদ সমুদ্রের ফেনায় মৎস্যকন্যার সঙ্গে জলকেলি করবে। আমার  নিষেধাজ্ঞাকে ফুৎকারে উড়িয়ে আমাকে  পাঁজা কোলা করে ঢেউয়ের সামনে চলে আসলো। পূর্ণিমা রাতে তাজমহল দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে,তারাই উপলব্ধি করতে পারবে পূর্ণিমা রাতে শঙ্করপুরের সমুদ্র। মিনিট পাঁচেক হুটোপুটি করার পর  রাহুলকে দেখতে না পেয়ে  চিৎকার করতে থাকি রাহুল  রাহুল বলে। কোন  লাভ  হয়না। নোনতা বাতাসই সারাগায়ে ছুঁচালো হয়ে বিঁধতে থাকে। সমুদ্র ওকে ফেরত দেয় ঠিক দুদিন বাদে,সেই জায়গায়।

         সুপ্তিদি থামল, আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই লোডশেডিং হলো। সুপ্তিদির মুখটা অন্ধকারেই মিলিয়ে গেল। কান্নাভেজা কন্ঠের কথা, আমার  উচিত ছিল ওকে বাধা দেওয়ার। সরা জীবন ধরে  থেকেই যাবে আমার এই আপশোষ।

অসিত কুমার পাল--মা ও ছেলের অদ্ভূত ভালোবাসা

অসিত কুমার পাল

মা ও ছেলের অদ্ভূত ভালোবাসা 
****************************

রমা অনেকদিন পরে বাবার বাড়িতে এসেছে ।  অবশ্য কয়েক বছর আগে বাবা মারা গেছে । একমাত্র ভাই রমেশ চাকরী পেয়ে পুনেতে চলে যাওয়ায় মা বাড়িতে একাই থাকে , নিজেই রান্না করে খায় ।

 রমা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল তার মা প্রতিদিনই অনেকটা সময় নিয়ে দুপুর বা রাতের খাবার তৈরি করে ।  রোজই নতুন নতুন পদ রান্না করে ।  রান্না শেষ হলে নিজে খাওয়ার আগে  মা খুব যত্ন সহকারে সেদিনের খবরের কাগজের প্রথম পাতার পাশে রান্না করা ভাত বা রুটির ছাড়াও ডাল তরকারি চাটনি ইত্যাদি সাজিয়ে রাখে । তার পরে সেসব খাবারের ছবি তুলে হোয়াটসএপ করে রমেশের কাছে পাঠিয়ে দেয় ।

 কয়েকদিন ধরে একই রুটিন দেখার পরে কৌতুহল বশত রমা জানতে চাইল - মা, রোজ খাওয়ার আগে এভাবে ফটো তোলাটা কি তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে ?

 মা বলল - আর বলিস না । বেচারা রমেশ তো  চাকরীর জন্য পুনেতে থাকে  । সেখানকার হস্টেলের খাবার নাকি একেবারে অখাদ্য । রমেশই আমাকে  বলেছে - রোজ দুবেলা খাওয়ার আগে আমি যদি ভালো মন্দ খাবারের ছবি তুলে পাঠাই তাহলে সেই ছবি দেখে ওখানকার অখাদ্য খাবারগুলো খেতে  তার  নাকি ভালো লাগবে ।

 রমা অনুযোগ করল - মা, তুমি ওকে আদর দিয়ে বাঁদর করে তুলেছ । ও এখন বড়ো হয়ে গেছে ,   তবুও বাচ্চাদের মত তোমার কাছে আবদার করে চলেছে । তুমি ওর কথায় কান দাও কেন ? মা কিছু না বলে একটুখানি হাসল ।

রমা একটু পরে রমেশকে  ফোন করে অভিযোগ করল -   ভাই তুই, মাকে এত খাটাচ্ছিস কেন ?  তোর আবদার রাখতে মাকে রোজ  নতুন নতুন রান্না করতে হচ্ছে, ছবি তুলে হোয়াটসএপ করতে হচ্ছে । ওত দূরে থেকেও মাকে না জ্বালালে তোর  কি খাবার হজম হয়  না ?

 রমেশ  খানিকটা হেসে নিল । তারপরে বলল - নারে দিদি, এমন কোন কথা নয় । আমি  মাকে জ্বালাচ্ছি না ।
আসলে  বাবার মৃত্যু, তোর বিয়ে আর আমি চাকরী নিয়ে পুনেতে চলে আসার পরে মা খুব একা হয়ে গেছে ।

 গতবার যখন বাড়িতে গিয়েছিলাম, তখন কাজের মাসিমা বলল মা প্রায় দিনই কিছু রান্না করে না । হয়তো চায়ের সঙ্গে পাউরুটি খেয়ে নেয় নয়তো শুধুই খিচুড়ি । সারা দিন চুপ চাপ বসে থাকে ।

 মা যাতে রোজ রান্না করে , সেজন্যই আমি এই মতলব বের করেছি । আমাকে ফটো পাঠানোর জন্যই মা রোজ নিত্য নতুন রান্না করে । আর খেয়েও নেয় । আর রান্নাতে ব্যস্ত থাকে বলে মা ততটা নিঃসঙ্গতাও অনুভব করে না ।

ভায়ের জবাব শুনে রমার চোখ জলে ভরে গেল । সে রুদ্ধকন্ঠে বলতে পারল - ভাই,  যতটা ভেবেছিলাম তুই তার থেকেও অনেক বড় হয়ে গেছিস । তোর মত সবাই এমন করে মায়ের কথা ভাবতে পারে না ।

------------_------------

Saturday, 4 December 2021

স্ত্রী-- তৈমুর খান


স্ত্রী
💔

 তৈমুর খান



 ভোর থেকেই ডাক্তারখানায় মানুষের আনাগোনা। সকাল ৭-টা হলে একজন কর্মচারী কাগজ-কলম নিয়ে এসে হাজির হন। হাঁক দিয়ে বলেন: যারা ডাক্তার দেখাতে এসেছেন, তারা একে-একে নিজের নাম ও ঠিকানা বলুন এবং ফিজের ৭০০-টাকা জমা দিন।

   তখন বেশ হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কে কার আগে নাম লেখাতে পারবে তারই প্রতিযোগিতা।

    আমি সবার আগে এসেও পারলাম না। আমার সিরিয়াল হল ৩০,অর্থাৎ সবার শেষে। রাত দুটোতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়তো সন্ধ্যে হয়ে যাবে। তা হোক, কী আর করা যাবে! চায়ের নেশা। ঘনঘন চা খেয়েই সারাদিন কাটিয়ে দেবো।

   সারাদিন মানে! সারাজীবনই তো কেটে গেল!

 কয়েকটা কবিতার বই, চাকুরীবিহীন দুটি সন্তান-সন্ততি এবং রোগা-পটকা একটা স্ত্রী। সংসার কোনোদিন সচ্ছল হয়েছে? থাক সেসব কথা। পৃথিবীতে আর ক'টাদিনই বা আছি! হার্ট অ্যাটাক হতে হতে একবার ফিরে এলাম। আজ তারই চেকআপের দিন। সঙ্গের লোকগুলো একে একে সবাই চলে গেল। আমিও যাবার জন্য পথের মাঝখানে।

     দূরে কী একটা পাখি ডাকছে: মেঘ হোক! মেঘ হোক!

     হায়রে মেঘ! কত মেঘই না দেখলাম! কত বৃষ্টিতে ভিজলাম। কত বজ্রবিদ্যুৎ চোখ রাঙাল। বৃষ্টিভেজা নারীশরীর নিয়ে কত কবিতাই না লিখলাম। কত নক্ষত্র ফুটল। কত অদৃশ্য রূপসী উড়ে গেল মাথার ওপর। দোকানের এক কোণে বসে বসে কত কথাই মনে পড়ছে। কাগজ-কলম থাকলে এসব নিয়ে কবিতাও লেখা যেত। দুপুর গড়িয়ে গেছে। কত নম্বর সিরিয়াল চলছে গো?

      পাশ থেকে একজন বলল: ২৭ নম্বর।

     —তাহলে তো আমাকে এবার তৈরি হতে হবে!

      লোকটি বলল: একজন বিধবা ভদ্রমহিলা এসে খুব কাকুতি-মিনতি করছে ডাক্তার দেখাবে বলে, কিন্তু ডাক্তার ৩০-এর বেশি রোগী দেখবেন না।

 —কে ভদ্রমহিলা?

 কথা শুনেই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখি এলো চুলে দাঁড়িয়ে আছে অর্জি। হ্যাঁ ঠিকই, অর্জি বেগম!

      তখন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি। অর্জির দাদা আমার সহপাঠী। নানা ছুতোয় ওদের বাড়ি যেতাম শুধু অর্জিকে একঝলক দেখার জন্য। ওরকম বড় বড় চোখ, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল, দুধে-আলতা রং কতই-না ভাললাগত। খুব অল্পদিনেই ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। যেমন করেই হোক অর্জিকে পেতে হবে। একটাই লক্ষ্য। একটাই সংকল্প। যেদিন পুকুরঘাটে ভেজাকাপড়ে ওকে স্নান করতে দেখতাম, কিংবা ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টি পড়লে যখন ও খুব ছুটত, তখন আমার মনটা অস্থির হয়ে উঠত। ওর শরীরের লোভনীয় অংশগুলি যেন আকুল হয়ে ডাকত আমাকে। একখণ্ড শরীর কাপড়ের ফাঁকে জ্বলজ্বল করে উঠত। মনে হত ঐশ্বরিক আলোর বিভা। আমিন চমৎকৃত হতাম। তাকে নিয়ে স্বপ্ন বেড়েই চলল। সেই অর্জি আজ বিধবা!

       মনে মনে আমিই তো কবেই তাকে বিয়ে করে নিয়েছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমি তখন বিএ ক্লাসের ছাত্র। গরীব ঘরের সন্তান সব প্রস্তাব এককথায় নাকচ করে দিয়ে ওর বাবা বলেছিল: বামন হয়ে চাঁদে হাত!

      তারপর ভিন্ন জেলার এক গেরস্থ বাড়িতে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছিল অর্জির। শুনেছি তিন মেয়ে তার। দুটির বিয়েও হয়ে গেছে।

        ছুটে এসে হাত ধরল অর্জি। কোনো ভূমিকা না করেই বলতে লাগল: তৈমুরদা, আমি ক'দিন থেকে খুব অসুস্থ। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছি। আমাকে ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করে দাও। ঠিক সময়ে আসতে পারিনি।

     বহুদিন পর তোমাকে দেখছি অর্জি! তোমার এরকম চেহারা দেখব ভাবিনি! ঠিক আছে এসো।

 ডাক্তারের চেম্বার থেকে ডাক এলো: সিরিয়াল ৩০, তৈমুর খান!

 —এইযে আসছি!

 —মেয়েটি কেন? একে তো ফিরিয়ে দিলাম!

 —আজ্ঞে! নামটি আমিই লিখিয়েছিলাম আমার স্ত্রীকে দেখানোর জন্য!

    ডাক্তার অনেকক্ষণ মুখের দিকে চেয়ে রইলেন আমাদের।

শেষ বিকেলে---সাবিত্রী দাস




শেষ বিকেলে
          সাবিত্রী দাস 


 সবাই  অবাক হয়ে যাবে । শুধু অবাকই  বা কেন নিন্দা- মন্দও কম হবে  কিছু! আর কিছু না হোক ছি ছি  করার লোকের তো আর অভাব  নেই এ সংসারে! তবে কিনা  আশ্চর্য  হলো এটাই যে সাতান্ন বছর বয়সী কমলা প্রেমে পড়েছেন। তাও কিনা ফেসবুক করতে গিয়ে। তা একটু আশ্চর্যই বটে! বিশেষতঃ এই  বয়সী মহিলাদের  পক্ষে! সময় কাটাতে ফোনে  ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল বৌমা রমা,  তা সেখানেই আলাপ! জীবনের  বিচিত্র অভিজ্ঞতা,  রোমাঞ্চকর অনুভূতির
 কথা ভাগ করে  নিতে নিতে, দুজনের একাকীত্বের অনুভূতি কাটতে লাগলো। ভদ্রলোক থাকেন দুর্গাপুরে,সেখানেই কেটেছে চাকরি জীবন ,এখন অবসরের সময়। অকৃতদার মানুষ, রঙ তুলির  আঁচড়েই সময় কাটিয়ে দেন তিনি। 
 কলকাতায় এলে মাঝে মধ্যে,  দেখাও হয়  বৈকি !
         যে মানুষটা  মাত্র দুবছর  একসাথে কাটিয়ে তিরিশ বছর আগেই চলে গেছেন, তার কথা মনে করে নিজের মনকে প্রতিরোধ করতে অনেক চেষ্টাও করেছিলেন ,সেই স্মৃতিগুলোও এতটাই ঝাপসা  সময়ের বিবর্তনে যে  শেষ বিকেলের আলোটুকুকে আটকানো গেল না কোনোমতেই। 

         জীবনের অপরাহ্ন বেলায়  রথীনবাবুর হঠাৎ আগমনে জীবনটাই আমূল বদলে গেছিল। বদলে যেতে  থাকলেন ক্রমশ!   এক জীবনেই যেন জণ্মান্তরের অনুভূতি!  প্রেমের  কথা এতদিন  কেবল শুনেই এসেছিলেন  ,এখন টের পেলেন হাতে নাতে। বুকের ভেতরটায় যে কদম ফুল ফুটে ওঠার  সৌরভ! কেমন  একটা ঘোরের  মধ্যে সময় কাটতে লাগলো।   পরিবর্তন   চোখে  পড়লো  বৌমা রমার! তার চোখ  এড়ানো  কঠিন। সে একদিন  দুপুর বেলায় একটু একটু করে  সমস্তটা জেনে নিল  কবে, কেমন করে  আলাপ, পরেই বা দেখা হতো কিভাবে।রথীনবাবুর  সম্পর্কেও জানতে চাইলে বললেন কমলাদেবী রথীনবাবুর  একাকীত্বের  কথা, তার শিল্পী জীবনের কথা! বলতে বলতে  দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল , বৌমা জিজ্ঞাসা  করলো রথীনবাবুর সাথে থাকতে পারলে তিনি সুখী হবেন কি না! ওনাকে ছেড়ে  থাকতে  কমলাদেবীর কষ্ট হয় কি না। চোখ নামিয়ে নিলেন কমলাদেবী , এতেই যা বোঝার বুঝে নিলো ! সবটুকু শুনে বৌমা সাহস দিয়ে বলল রথীনবাবুর কাছে গিয়ে থাকতে । সেদিন রাতেই  রমা স্বামীকে বললো  'বাবার মৃত্যুর পর মা তোমাকে বড়ো করে তোলার জন্য অনেক  কষ্ট করেছেন। তার অনেক ত্যাগ স্বীকারের মধ্য দিয়েই  তোমার বড়ো হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে। এখন  সময় হয়েছে মায়ের নিজের জীবন নিয়ে  ভাবার। মা তার  জীবনে সঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন। কারোর আপত্তি থাকার কথা নয়।' ছেলে চুপ, মুখ দেখে মনের ভাব বোঝা কঠিন!  ছেলের পক্ষে এমনটা ভাবাই কঠিন,আত্মত্যাগী মাকে দেখেই তৃপ্তি পেতে চায় ছেলের মন।  তাই তার যে খুব একটা সম্মতি থাকবে এমন নয় কিন্তু বৌমাটি ভারি বুদ্ধিমতী  আর বিচক্ষণ। 
পরদিন  ছেলেও সম্মতি জানালো। বৌমা যাবে সাথে, রথীনবাবুর সাথে দেখা করতে চায় । যত্ন করে  বৌমা ব্যাগ   গোছাতে লাগলো।  বাজারে গিয়ে কমলা রথীনবাবুর পছন্দের কটা জিনিসও চুপিচুপি কিনে এনেছেন সবার অলক্ষ্যে । আগামীকাল সকাল সাতটায় ট্রেন। সকাল দশটার মধ্যেই  পৌঁছে যাবেন। রথীনবাবুকে  বলেছেন  স্টেশনে  আসতে।

            কখন থেকে স্টেশনে ঠায় বসে আছেন,সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না।বারবার মোবাইল বের করে  সময়  দেখছেন ।
আরে দশটা বাজতেই  দেরী আছে দেখছি। মাথা টাথা খারাপ হলো নাকি! হেসে উঠলেন নিজের মনেই , কমলার আসবার কথা শুনে তিনি এতটাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন যে সময়টাও গুলিয়ে ফেললেন!  সময় কাটানোর জন্য উঠে পায়চারি করতে শুরু করলেন। পায়চারি করছেন আর ভাবছেন  যা ঘটতে যাচ্ছে তাকি সত্যিই নাকি স্বপ্ন দেখছেন।  তার পক্ষে  যে কল্পনা করাও অসম্ভব  ছিল।সেই অসম্ভবটাই আজ সম্ভব হতে চলেছে ,আমার কল্যাণে। 
 দশটা  পনেরোতে  ট্রেনটা এসে থামলো । ট্রেন থেকে নেমে এদিকেই আসছে, পাশের মেয়েটিই বোধকরি  বৌমা!  কাছে আসতেই পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই আশীর্বাদ করলেন । আবার বলে কিনা 'মাকে দিতে এলাম।'
বললেন রথীনবাবু-'চলো বাড়ীতে,যদিও বড়োই অগোছালো ঘর আমার ।' হাসছে বৌমা,বলল 'না আজ নয়,এখুনি ফিরতে হবে।  সবাইকে নিয়ে আসবো নাহয় আরেকদিন। ঘর গোছানো হোক মা তো এসেই গেলেন। '
      ট্রেনে  উঠে হাত নাড়ল রমা,ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে। যতদূর দেখা সম্ভব তাকিয়ে রইলেন,  কমলাদেবীর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলে  ভিজে যাচ্ছে বুকের ভেতর পর্যন্ত । 

                     ********

বেদনার বালুচরে--শংকর ব্রহ্ম




বেদনার বালুচরে

শংকর ব্রহ্ম

-----------------------

গল্প হলেও সত্যি।  এটা কোন গল্প নয়। বাস্তবের এক মর্মান্তিক করুণ কাহিনী।

                    নজরুলের জীবনের শেষ চৌত্রিশবছর ছিল মর্মান্তিক । অনেক অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন তিনি।

         ১৯৪২এর ৯ই আগষ্ট থেকেই কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন । তখন তিনি আক্ষরিক অর্থেই কপর্দকশূন্য । সংসারে দুই শিশুপুত্র , পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীপ্রমীলা , শাশুড়ি গিরিবালা । ১৭০০ গানের রেকর্ডে লক্ষ লক্ষ টাকা মুনাফা করেও গ্রামোফোন কোম্পানী তার কোন রয়ালটি দেননি ,তাঁর লেখার প্রকাশকরা ফিরেও তাকাননি। 

কবির অসুস্থতার কারণ , ‘নবযুগ’ সম্পাদনা কালে একবার কবি উত্তরপাড়ার এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় , একদল  দুষ্কৃতিদের দ্বারা প্রহৃত হয়েছিলেন , তাঁর ঘাড়ে ও মাথায় কঠিন আঘাত লাগে।  নির্বাক কবি যখন বাংলাদেশে (১৯৭২), তাঁর চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেলবোর্ড, কবির ঘাড়ের পুরাতন কঠিন আঘাতের চিহ্নটি সনাক্ত করেছিলেন ।
তার একবন্ধু জুলফিকার হায়দার খবরের কাগজে প্রচার করে দেন নজরুল ‘উন্মাদ’ হয়ে গেছেন । 
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আর্থিক সহায়তায় কবিকে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য মধুপুর পাঠানো হল ১৯৪২-এর ১৯ শে জুলাই , কিন্তু অর্থ শেষ হয়ে যাবার পর কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয় ২১শে সেপ্টেম্বর । ১৯৪৪-এর ২৪শে মে আনন্দবাজার পত্রিকার ‘কবি নজরুল পীড়িত’ শিরোনামে একটি আবেদন প্রচারিত হয়। 
এরপর কয়েকটি সাহায্য সমিতি গঠিত হয় । কলকাতার সুখ্যাত চিকিৎসকেরা কবিকে দেখেন একাধিকবার , কিন্তু নিরাময়ের কোন লক্ষণ দেখা যায় না । কবি কাজী আবদুল ওদুদের উদ্যোগে গঠিত ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’র উদ্যোগে কবিকে রাঁচির মানসিক চিকিৎসালয়ে পাঠানো হয় ১৯৫২র ২৫শে জুলাই । কিন্তু চারমাস চিকিৎসাধীন থেকেও তাঁর কোন উন্নতি না হওয়ায় ফিরিয়ে আনা হয় কলকাতায় । পরের বছর ১০ই মে ১৯৫৩ কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় লন্ডনে। সেখানকার চিকিৎসকেরা মতপ্রকাশ করেন যে কবির ব্রেন কুঁকড়ে গেছে অর্থাৎ মষ্টিস্কের সংকোচন হয়েছে । লন্ডন থেকে ১০ই ডিসেম্বর নজরুলকে নিয়ে যাওয়া হয় ভিয়েনায় । সেখানেও চিকিৎসকের অভিমত ছিল কবিকে আর সুস্থ করে তোলা যাবে না । এরপরেও পূর্ব জার্মানীর বন বিশ্বিবিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক রুশ ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছিলেন । তাঁর অভিমত ছিল যে অনেক দেরি করে রোগীকে আনা হয়েছে। সাতমাস বিদেশে বৃথা চেষ্টার পর কবিকে ফিরিয়ে আনা হয় কলকাতায় ১৯৫৩-র ১৪ই ডিসেম্বর ।
এর পরেও তেইশ বছর জীবিত ছিলেন নজরুল। অভাবের তাড়না , মানসিক কষ্ট , নিঃসঙ্গতা , পরিচিত বন্ধুদের দূরে চলে যাওয়া , অবহেলা এসবই ছিল কবির শেষ জীবনের সঙ্গী । পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বিনা ভাড়ায় থাকার জন্য ফ্ল্যাটের বন্দোবস্ত ও দুইবাংলা থেকেই লিটারারি পেনশনের ব্যবস্থা হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি এসেছিল । ১৯৬২র ২৩শে জুন স্ত্রী প্রমীলার দেহাবসান পর , কবি আরও ভঙে পড়েন।
জীবনের শেষ চারটি বছর কবি বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় তাঁর প্রাপ্য সমাদর পেয়েছিলেন। 
মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করেন বাংলাদেশ সরকার।
তারাই মৃত্যুর পর তাঁকে 'জাতীয় কবি' হিসাবে সম্মানিত করে কবিকে যোগ্য মর্যদা দিয়েছেন বলে আমার মনেহয়।

-----------------------------------------------------------------

অদ্ভূত আঁধার এক...শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার




অদ্ভূত আঁধার এক....
*******************
শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার 

দু'ঘন্টার ওপর এখন কারেন্ট নেই। রাতের খাবারটা ঢাকা আছে টেবিলের একপাশে। ওটা আর বোধহয় আর কাজে লাগবেনা। একটা দেশী মদের বোতল শেষ হয়ে গিয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে, ছড়িয়ে আছে ছোলা বাদামের খোসা, একটা কাঁপাকাঁপা শিখায় জ্বলছে মোমবাতিটা।

কাল ভোরেই হয়তো একশো কোটি'র ওপর আর একটি নতুন শিশুর জন্ম হয়ে সেই সংখ‍্যাটা  বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ওই সদ‍্যোজাত শিশুটি হবে জারজ ও মানসিক ভারসাম‍্যহীন এক মানবীর গর্ভজাত। জেলখানার হাসপাতালে  জন্মের মুহূর্ত থেকেই অন্ধকার পাপ আর তার নিষ্ঠুর আলিঙ্গন ওকে দিতে চলেছে ঘৃণা আর যৌনতাড়নার নিচ্ছিদ্র শৈত‍্য।

মিতালী 'সন্তান! সন্তান!'  করে খেপে উঠেছিল। ওর স্বামী রূপমকে নিজেই  জোর করে ফার্টিলিটি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে দুজনেই টেস্ট করায়। রূপমের অ‍্যাজোস্পার্মিয়া ধরা পড়ায় যতোটা হিংস্র হয়ে উঠেছিল মিতালী, ততোটাই স্বাভাবিক জীবন থেকে গুটিয়ে গিয়েছিল রূপম। 
*********
সেদিন সন্ধেবেলা ছিল ওদের বিবাহবার্ষিকী। সকালে মিতালী ডিনারে নেমন্তন্ন করল ফোন করে। মিতালী ভাল রান্না করে বরাবর। মাটন ভূনা আর পরোটা তার সাথে চিকেন তন্দুরী সহযোগে ব্ল‍্যাক লেবেল। রূপমটা কখনোই  খুব বেশী মদ খেতে পারত না। সেদিন কেন জানি না ও চারটে পেগ নামিয়েই  হাই হয়ে গেল। হঠাৎ মিতালীর নাম ধরে  আমাকে নোংরা খিস্তি করতে লাগল ওর সামনে । মিতালী একবারও কিন্তু ওকে বারণ করতে এল না! আমিও নেশার ঝোঁকে  রেগে গিয়ে টেবিলে রাখা একটা পেতলের ঘন্টা তুলে রূপমের মাথায় দুম্  মেরে বসলাম। দরদর করে রক্ত পড়তে লাগল রূপমের মাথা থেকে। তারপর অবসন্ন হয়ে কৌচে এলিয়ে বসতেই মিতালী দৌড়ে এসে বেডরুম থেকে একটা বালিশ এনে রূপমের মুখে চেপে ধরল। দশটা মিনিট! ব‍্যস্! রক্তাক্ত রূপম তারপর একটা লাশে জাস্ট পরিণত হল। খাওয়াদাওয়া যে আর হলনা, বলাই বাহুল‍্য। 
**************
তারপর....তারপর মিতালী একটা নীচ নোংরা নাটকের যবনিকা পতনের আগের দৃশ‍্যের মত আমাকে হাত ধরে টেনে ওদের বেডরুমে নিয়ে গিয়ে হিংস্র বাঘিনী যেমন করে তার শিকারকে ছিন্নভিন্ন করে ঠিক তেমন করেই পাপ  আর লালসার আঁচড়ে আমার শরীরটাকে ক্ষতবিক্ষত করে  ওর অবদমিত সন্তানকামনা চরিতার্থ করছিল মিতালী.....

********
পুলিশের কাছে যখন মিতালী ধরা দিল তখন ও সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম‍্যহীন। মামলা গড়াতে গড়াতে তিন চার মাসে ওর শাস্তি ওর হলনা ঠিকই কিন্তু প্রেগন‍্যান্সীটা শরীরে ততোক্ষণে স্থিতু  হয়েছে। আমি দেখতে যেতাম জেল হাসপাতালে  দু একবার। নির্বাক, উদাসী মিতালী চুপ করে বড় বড় চোখ মেলে আমায় দেখত আর ওর স্ফীত উদরটা মাঝেমধ‍্যে স্পন্দিত হয়ে আমায় ওই রাতটার কথা মনে করিয়ে দিত।
***********
এখন স্লিপিং পিলের পুরো পাতাটা খালি। দেশী মদ তার উপর আগুন জ্বালাচ্ছে গরলের। রূপমকে আমি খুন করতে চাইনি, কিন্তু তাও আমিও খুনী । আমি কি মিতালীকে আটকাতে পারতাম না? নীল শিফনের ফাঁক দিয়ে মিতালীর ফর্সা ধবধবে  বিভাজিকা কি আমায় পাপের ইন্ধন যোগায় নি একবারও?

 আমি অন্তত আজীবন আমার সন্তানের দিকে যেমন চোখ তুলে তাকানোর সাহস দেখাতে পারবনা তেমনই কখনো ওকে সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে একটা সুস্থ ভব‍্য জীবনও দিতে অপারগ।

তাই আমি আজক‍ের পর থেকে একজন  কাপুরুষ আর ঘৃণ‍্য  খুনের সহযোগকারী হয়ে আর বাঁচতে চাইনা।
 
"কাল মর্গের ২০২ নম্বর ড্রয়ারে রূপম তোর সাথে আর  একবার দেখা হলে, এবারে ক্ষমা করে দিস্ ভাই !" 
******************

প্রাপ্তি--অদিতি ঘটক

প্রাপ্তি অদিতি ঘটক কেসটা সাজাতে গিয়ে বারবার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, অথচ হাতে সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি এফ. আই. আর. এর খসড়াটা  তৈরি করতে হবে। পরমার্...