Wednesday, 8 December 2021

প্রাপ্তি--অদিতি ঘটক


প্রাপ্তি

অদিতি ঘটক


কেসটা সাজাতে গিয়ে বারবার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, অথচ হাতে সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি এফ. আই. আর. এর খসড়াটা  তৈরি করতে হবে। পরমার্থর মত দক্ষ উকিলের কাছে যা একেবারে রুটিন ওয়ার্ক। তবুও, এই তবুও খোঁচাটাই ওকে কাবু করে দিচ্ছে। অপরাধ, নিরপরাধ সমস্ত সংজ্ঞা গুলিয়ে যাচ্ছে। কত কঠিন কেসই তো ওর কাছে এসছে এই রকম  উভয়সঙ্কটে ওকে কখনো পড়তে হয়েছে কি?

মেয়েটা যেন ওর রাতের স্বপ্নে হানা দিচ্ছে, করুন মুখে বলছে বলুন,"আমি অপরাধী?" তত পরমার্থর অস্বস্তি বাড়ছে? কাল পুলিশের কাছে যাওয়ার ডেট। মেয়ের বাপের বাড়ি, ডাক্তার, মেয়ে সবার বিরুদ্ধে তার মক্কেল অভিযোগ দায়ের করবে

 সঠিক ভাবে গুছিয়ে লিখতে হবে --


"একটি প্রাণ কে পৃথিবীর আলো দেখার অধিকার কেন দেওয়া হল না !বাবার মত কেন নেওয়া হল না ?"------

এই শেষ কথাটা কয়েকটা প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, না এই শেষ কথাটা নয় এই  কেসটা ই বেশ কয়েকটা প্রশ্ন তুলছে,  চিকিৎসা বিজ্ঞানের যদি অগ্রগতি না হত তাহলে কি আমরা মেনে নিতাম না ! লক ডাউন একটা শিশু হত্যার জন্য কতটা দায়ী ? কারণ মেয়েটি পিতৃগৃহে গিয়ে আর আসতে পারেনি।  দু জায়গাতেই পরিস্থিতির বিপাকে সঠিক চিকিৎসাও করাতে পারেনি। বাবাও সময় মত সশরীরে পৌঁছতে পারেনি। ডাক্তার কি পারে শুধু মায়ের ও তার বাপের বাড়ির মতের ভিত্তিতে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে ?যেখানে মায়ের প্রাণ সংশয় নেই ! যে শিশু কয়েক ঘন্টার অতিথি মাত্র তাকে জন্ম দেওয়ার দায় কি মায়ের আছে? বাবার অধিকার কতটা ? একটি ভ্রূণ যা গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ বিকশিত হয়নি তাকে কি পৃথিবীতে নিয়ে আসা উচিত ? না ভূমিষ্ঠ হওয়ার অধিকার তারও আছে? কোন ত্বত্ত মানা উচিত ? যোগ্যতমের উত্তরাধিকার না মানবতা? 

অ..নেক অ--নেক জটিল প্রশ্ন যা বার বার পরমার্থকে আয়নার সামনে দাঁড় করাচ্ছে, নিয়ে যাচ্ছে ওর ছায়াছন্ন অতীত সরণিতে।

 পরমার্থ 'ল' আর মধুপর্ণা জেনেটিক্স তবুও ওদের মনে বসন্তের রঙধরতে কোনো অসুবিধা হয়নি। বহুদিন ওরা হাত ধরাধরি করে গোধূলির হলুদ আলো মাখতে মাখতে কৃষ্ণচূড়া বনের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গেছে। নদীর ছলাৎ ছল ওদের বুকেও তুলেছে তরঙ্গের দোলা।  কতবার পার্কের গেটকিপারকে ঘুষ দিয়ে বাড়িয়ে নিয়েছে একসঙ্গে থাকার সময়। আরও আরও কত স্মৃতি... সেই মধুপর্ণা,  নরম, সরম, মায়া জড়ানো, হাসিখুশি মেয়েটা এত নিষ্ঠুর ! ভাবতেও অবাক লাগে পরমার্থর

"দাদা, আপনাকে ডাকছে--"

চিন্তা সূত্র ছিঁড়ে যায়। পরমার্থ নীচে নেমে খাবারের বাটি তুলে নেয়। পরম যত্নে আলা ভোলা মেয়েটার মুখের লালা মুছিয়ে বলে, প্রাপ্তি মায়ের আজ আবার বাবির হাতে খাওয়ার সখ।

সেই কবে মধুপর্ণা খেলার ছলে পরমার্থর সিমেন টেস্ট করে জানায় তার শুক্রাণুর গঠন ত্রুটিপূর্ণ আর এটা জেনেটিক ডিসঅর্ডার।  অতি দামি ওষুধ ইনজেকশনেও সরানো সম্ভব নয়। রিপোর্টটা বিয়ের দুদিন আগে হাতে ধরিয়ে মধুপর্ণা হার্ভার্ড চলে যায়। হাইয়ার স্টাডিজ এর জন্য। উপহার স্বরূপ দিয়ে যায় তার ডিম্বাণুর ভল্ট নাম্বার।

'প্রাপ্তি' পরমার্থর সেই ভালোবাসার সন্তান যাকে সে বুক দিয়ে লালন করছে।

#######################

 

Tuesday, 7 December 2021

অনিকেত--মৌ দাশগুপ্ত

*অনিকেত*
মৌ দাশগুপ্ত

পারুলগ্রামকে অজ পাঁড়াগা বললেও অত্যুক্তি হয়না। যদিও প্রধানমন্ত্রী সড়ক যোজনায় পাকা রাস্তা হয়েছে, বিদ্যুতের খুঁটি বসেছে। কেবল চ্যানেল আছে।তবু নেই এর তালিকাও ছোট নয়।

সেই পারুলগ্রামের সবেধন নীলমণি মেয়েদের জুনিয়রস্কুলে যখন দেবারতি অঙ্কের টিচার হিসাবে জয়েন করলো তখন ওর চেনাপরিচিতরা খুব একটা আশ্চর্য হয়নি।অন্তর্মুখী স্বভাবের দেবারতি মুখে কিছু না বললেও কম বয়সেই পিতৃহারা মেয়েটা পিঠোপিঠি ভাইয়ের আত্মহত্যা, মায়ের অকালমৃত্যু, প্রেমে ধোঁকা খাওয়া, বিয়ের বছর না ঘুরতেই ডিভোর্স সব মিলিয়ে আবাল্য চেনা শহর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেওয়াটাই যে বেছে নেবে, এটা যেন সবারই জানা ছিল। নয়ত ফলিত গণিতে পিএইচডি করতে করতে সব ছেড়েছুড়ে ওই রকম কেরিয়ার বেছে নেওয়াটা ওর মত মেধাবী মেয়ের কাম্য থাকতে পারেনা। চাপা স্বভাব বলে স্কুল কলেজেও দু একজন ছাড়া কারো সাথে সেরকম বন্ধুত্ব গড়ে ওঠেনি, পারিবারিক দুর্ঘটনার পর আত্মীয়দের সাথেও যোগাযোগ রাখত না বিশেষ, নিজের বলতে কেউই ছিলনা মেয়েটার তাই কোন পিছুটানও ছিল না।তবু পারুলগ্রামে আসার ছয়মাসের মধ্যে যে দেবারতি ঘুমের ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যা করে বসবে তা বোধহয় কেউ ভাবতেও পারেনি। মরার আগে ডায়েরীর খোলা পাতায় একটা চিঠি লিখে গেছিল,

আমার শহরে কোন কাঁটাতারের বেড়া নেই,তবু আমরা রোজরোজ সাবধানী পায়ে সীমান্ত মেপে নিই।

আমার ভাই যেদিন বলেছিল পাশের বাড়ির রাবেয়াকেই বিয়ে করবে,সন্ধ্যারতির প্রদীপ ফেলে মা মুঠোভরা ধুতরার বীজ দেখিয়ে বলেছিলেন দু'জনের কোন একজনকে বেছে নিতে।অথচ মা মরা পাশের বাড়ির রাবেয়াকে আমার মা যত্ন করে চুল বেঁধে দিতেন, রান্না শেখাতেন,ওর অক্ষরজ্ঞানও হয়েছিল আমার মায়ের হাতে, আমার পুরানো স্লেটে।বোকা ভাইটা দুজনকে বাদ দিয়ে রেললাইনকে নিজের ভেবে জড়িয়ে ধরেছিল।সেদিন থেকেই দু'বাড়ির মধ্যে কাঁটাতারের বেড়া উঠতে দেখেছিলাম। মা তারপরেও রাবেয়াকে দেখে চোখের জল ফেলতেন কিন্তু বেড়া ভাঙতে পারেননি।

মাকে হারিয়ে আঁকড়ে ধরেছিলাম কুষানকে, সংসার পেতেছিলাম, কিন্তু আমার ভজনের সাথে ওদের ক্রিশমাশ ক্যারলের সুর মেলেনি। ওর পরিবার ওকে তাই ছিনিয়ে নিয়ে গেল নিষিদ্ধ চৌকাঠ ডিঙানোর দায়ে।সেদিনও আরেক কাঁটাতারের বেড়া উঠতে দেখেছিলাম। রাস্তায় দেখা হয় দুজনের, আমরা হাসি, কথা না বলে এড়িয়ে যাই পরস্পরকে, বেড়া কিন্তু ভাঙে নি।


মনে মনে মেপে নিই নিজের বদলে যাওয়া চাহিদা,মাকে মনে পড়ে, ভাইকে, রাবেয়া, আর কুষাণকেও, আমার সেই চারদেওয়ালের ঘরকে। কিন্তু চোখ ফিরালেই চারপাশে নানা মাপের কাঁটাতার বেড়া,আমি যে আর বাড়ি ফেরার পথ খুঁজে পাইনা।"


স্কুলের নথি খুঁজে পাওয়া ঠিকানায় খবর গেছিল, ফাঁকা বাড়ি, কেউ থাকেনা, কি ভেবে তাও কদিন মর্গে শবদেহ রেখে দিয়েছিলেন থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসার। যদিও বেশিদিন রাখতে হয়নি। তিনদিনের মাথায় দেবারতি ব্যানার্জি নামের ট্যাগ লাগানো বরফে শোয়ানো দেহটার সাথে চিঠিটাও তুলে দিয়েছিলেন শেষকৃত্য করতে আসা মেয়েটির হাতে, যে নিজের নাম বলেছিল রাবেয়া দেবাশীষ ব্যানার্জি।

Monday, 6 December 2021

সম্পাদকীয়--



সম্পাদকীয়--
প্রকৃতি রং বদলায়--মানুষের মনও বুঝি একই ভাবে রূপান্তরিত হয় l বয়স বিভাজনের  সঙ্গে সঙ্গে ঋতুচক্রের ধারা পরিবর্তন জীবনের ধারার সঙ্গে মিলে মিশে যায় l পরিবর্তিত বয়সের, রূপ ধারা যেন অন্যরকম, সমস্ত সংযমের মধ্যে থেকে কখনো মনের বাগানের কোণে একটা ফুল ফুটে ওঠে, অলালায়িত, অবহেলিত, সে ফুল কবে যে ধুলোয় মিশে যায় সে খোঁজ বুঝি কেউ রাখে না l 
পৃথিবীর বুকে সব স্মৃতিচিহ্ন ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই সচেষ্ট থাকেন l মনের অজান্তে সৃষ্টির বৈঠা চলে, মাঝ গাঙের রুপালি মাছটা আলতো ধরে রাখা থাকে মনে l এই মন, এই দেহ, ভ্যানিশ পদার্থের এক মিউজিশিয়ানের সৃষ্টি বলে মনে হয় l এই চমক আবার গোধূলি শেষের ধূসর বেলার ছাই বর্ণ হয়ে মনকে বিষাদময় করে তোলে l
সৃষ্টি কোথাও থেমে নেই, আমি নেই, তুমি নেই, অথচ আছির মধ্যে দিয়ে বয়ে যাচ্ছি আমরা l  আজের ভাবনাগুলোর এক এক টুকরো নিয়ে তোমরা না হয় আগামী নব্য পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিও l আমাদের আজের গল্প কবিতা লেখনী সৃষ্টির কুচি কুচি পাতা নষ্ট বিবর্ণ ফাগুনের ধ্বংসাবশেষ থেকে তাকে না হয় তুলে নিও l সব কিছু না হয় ধোপদুরস্ত করে জুড়ে নিও আবার l
ক্ষরিত বালির জটলায় কংক্রিট জীবনের গাঁথুনিতে একটা অর্ধ মানুষের কষ্ট কষ্টিপাথর, সে ফসিল খুলে পড়ে নিও l তার বুক খুলে আশ্বিনের নবান্নর ছোঁয়া, গোধূলির বধুটির পেট চিরে সূর্যাস্তের সে সব খেলার খেয়াল জুড়তে থেকো, সে সব ক্ষয়িত ভাষা, সে সব পতিত সংলাপ, সে সব দৌরাত্ম্য পতনের পরিণতিগুলি সব ভাঙাচোরা থেকে আবার তৈরি হবে সৃষ্টির কলম, আকাশের কাগজে তোমায় দেবো প্রেমপত্র, আলতো ছোঁয়াগুলি প্রেমিকার বুকে তোলপাড় তুলে আবার আসুক না ফিরে তোমার কাছে l
এবার রাখি ভাব-ভাষার পাগলামি l 
আসুন সৃষ্টির কলমে কতটুকু এগুলো আমাদের  বর্ণালোক ? কতটা ভাব ভাবনা পাঠকের মন কেড়ে নিতে পারল? ভালো-মন্দের টানাপোড়েনে কতটা উদ্ভিন্ন কাহিনী আমাদের জীবনে শান্ত অশান্ত বিভ্রান্ত বিকৃতি এনে দিল? মনের মাঝে, 
ভাষার দৃষ্টিকোণে, শৈলীর বিভাজনে, সৃষ্টির পরিপাটি নৈপুণ্যে কোন কোন লেখক খুলে দিতে পারলেন পাঠককুলের মনের দরজা? 
পাঠকবর্গের প্রতি আমার সনির্বন্ধ অনুরোধ, আপনারা বর্ণালোক পড়ুন l বর্ণ, মাধুর্য মেতে উঠুন l আপনারা ভুল-ত্রুটিতে  সোচ্চারিত হোন, ভালোকে ভালো, মন্দকে মন্দ বলে পথ প্রদর্শন করুন l এতেই আমরা ঋদ্ধ হবো l ধন্যবাদান্তে--সম্পাদক--তাপসকিরণ রায় l

সহ:সম্পাদকের কলমে--
কিছু শারীরিক অসুস্থতার জন্য এবার আমার লেখা দেওয়া হলো না। আবার সব সংখ্যায় আমি লিখব সেটাও হয় না। আপনাদের লেখায় সম্বৃদ্ধ হয়ে উঠছে পত্রিকা দিনকে দিন।--শমিত কর্মকার।

সহ সম্পাদকের কলমে--
হেমন্ত আসে ফসলের ডালি নিয়ে। হেমন্তে ফসল কেটে ঘরে তোলার পালা। ধূসর হেমন্তের দিনে  তাই ভরে যায় চাষির ধানের গোলা। গোলা ভরা ধানের দিকে তাকিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে  মানুষের  মন। আকাশ বাতাস সুরভিত নবান্নের সৌরভে,গ্রামের মানুষের মন  আমোদিত নূতন ধান, দুধ ,গুড় ,আদা, ফল-ফুলুরি দিয়ে পূজো আর উৎসবের অব্যাহত আমন্ত্রণে।সকলের জন্য রইল শুভেচ্ছা।পাকা ধানের সোনালী রঙের আবহে সবাইমেতে উঠুক নবান্নের সৌরভে। আমরাও নাহয় ততক্ষণে মেতে উঠি সুন্দর সুন্দর অণুগল্পের সৌরভে।-- সাবিত্রী দাস l

খরগোশ আর জাদুকরের গল্প--জয়িতা ভট্টাচার্য




খরগোশ আর জাদুকরের গল্প 
জয়িতা ভট্টাচার্য 

একটা গ্রামে কিছু মানুষ বাস করত।কেউ কুমোর,কেউ কামার,কেউ চাষী,কেউ ঘরামি। গ্রামের পাশে একটা নদী ছিল আর নদীর ওপারে বন। দু একজন কখনও সখনও ওপারে যেত মধুর লোভে,বন মোরগের মাংসের  লোভে।কেউ ফিরে আসত কেউ যেত বাঘের পেটে।
একদিন যখন লাল সূর্যের প্রথম রশ্মিটা দেখা গেল কালচে একটা মানুষের ছায়া পড়ল গ্রামে।সে সেই গ্রামের শেষে একটা কুটির বেঁধে বাস করতে শুরু করল। ওদিকটা ছিল বাদা অঞ্চল কেউ বিশেষ যেতো না।তবুও এক দুজন উঁকি ঝুঁকি দিতে যারা গেল তারা ফিরল না।কোনো খবরই পাওয়া গেল না। গ্রামের সর্দার সাহস করে লাঠি সোঁটা নিয়ে একদিন তার সঙ্গে  আলাপ করতে গিয়ে জানল সে জাদুকর।জাদুর বলে সে অনেক কিছুই করতে পারে এমনকি মানুষকে খরগোশ করে দিতে পারে। 
গ্রামে মাঝে মধ্যেই মানুষ নিরুদ্দেশ আর খরগোশ আর ছাগল বাড়তে লাগল। লোকের মনে এই প্রথম ভয় হলো। মনের শান্তি নষ্ট হলো।চাষবাস মাথায় উঠল।জাদুকর সেখানের রাজা হয়ে বসল।যা কিছু গ্রামের সম্পদ ছিল সব সে হস্তগত করে নিল। তার বদলে দুবেলা তারা খেতে পেল।গ্রামে আর চাষা নেই, কুমোর নেই ,ঘরামি নেই ,সকলেই তখন বাঁচতে পারলেই শান্তি পাবে যেন। সকলকেই জাদুকর ভিখারি করে দিল। খরগোশ করে দিল,ছাগল করে দিল।তাদের আর কাজ নেই।খিদে পেলে যা দেয় জাদুকর তাতেই তারা খুশি আর সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। ওরা ধীরে ধীরে সবাই জাদুকরের মন্ত্রে খরগোশ কিম্বা ছাগল হয়ে গেল।
এরপর মানুষের সন্তান সন্ততি কেবল খরগোশ আর ছাগল হয়ে জন্মায়।জাদুকরের মায়ায় তারা  দুবেলা যেটুকু  পায় তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। ঋতু  পাল্টায়, জন্ম আর মৃত্যু হয়।জাদুকরের শক্তি কমে আসে ,সে বৃদ্ধ হয় কিন্তু কারো আর মনে হয় না জাদুকরকে তাড়িয়ে দেবার কথা, মেরে ফেলার কথা কারন তারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ঘাড় হেঁট করে ভিক্ষা করতেই আরাম বোধ করে।তারা যে মানুষ তা একদিন সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে যায়।

শব্দের জানালা--তাপসকিরণ রায়



শব্দের জানালা 
তাপসকিরণ রায়

বর্ধমানে আমার এক জ্যাঠামশাই থাকতেন l আমি প্রায় প্রতিবছরই সেখানে ঘুরতে যেতাম l সেখানে আমি জ্যাঠতুতো ভাইবোনদের সঙ্গে মিলে মিশে যেতাম l তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি ।
আমরা গেলে জ্যাঠামশাই খুব খুশি হতেন l  আনন্দ প্রকাশের মধ্যে দিয়ে তার চোখ থেকে জল বেরিয়ে আসত l তার ভালবাসার আবেগ আমাদের ছুঁয়ে যেত l
আমি প্রায়ই একটা জিনিস লক্ষ্য করতাম, রাতের নির্জনতায় জ্যাঠামশাই একলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন l মনে হত, ফিসফিস করে কারো সঙ্গে তিনি কথা বলতেন--মনে হত তিনি কিছু শুনতে পাচ্ছেন, সে সব শব্দের অর্থ কি তিনি খুঁজে ফিরতেন ? আবার আমাদের সামনে পেয়ে তিনি খুব খুশিও হতেন l
জ্যাঠামশাইয়ের বয়স হয়েছিল, আশির কাছাকাছি l এখনো তিনি উচ্ছল, প্রাণবন্ত, আবেগপ্রবণ আনন্দের মধ্যে কোন গভীরতা থেকে তার কান্না বেরিয়ে আসতো, অশ্রুধার কান্না ।
বয়স হলে মানুষ বুঝি অনেকটাই এমনি হয়ে যায় l কারো মধ্যে প্রকাশ বেশি, অনুভব আবেগ বেশি, অশ্রুত কান্নার ভিড় তাদের চোখে এসে জমে থাকে ।
একটা অদ্ভূত ভাবনার মধ্যে হাসি আনন্দের সঙ্গেই তার কান্নার উৎস ফুটে উঠত ! আসলে মানুষের বুঝি একটা বয়স থাকে তার সীমানায় এসে গণ্ডীবদ্ধ সে জানে আর বেশি দিন এই পৃথিবীতে সে নেই ! আর এ কারণেই বুঝি অন্য অজানা এক পৃথিবীকে সে আগেভাগেই চিনে নেবার চেষ্টা করে l তার পরিবেশকে বুঝে নিতে সার্থক অথবা ব্যর্থ চেষ্টায় অনুপ্রাণিত হয় l
প্রায় সময় জ্যাঠামশায়ের বাড়ী আমরা দু-তিনদিন থেকে আবার ফিরে আসতাম l জ্যাঠামশাই আমাদের নিয়ে বেশ হাসিখুশি থাকবেন l এমনি একবার আমরা ফিরে আসব, জ্যাঠামশাই অঝোরে কাঁদতে থাকলেন, বলতে লাগলেন, হ্যাঁ, বাবারা কে জানে আর কোন দিন তোমাদের সঙ্গে দেখা হবে কিনা ! 
জ্যাঠামশাই কথা বলতে পারছিলেন না, চোখের জলে সবাইকে দেখতে চাইলেন তিনি, সবার সঙ্গে কথা বলে তিনি সরে গেলেন--অপেক্ষমান খোলা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন l
বাইরের হাওয়া জানালা ভেদ করে ঘরের ভেতরে ঢুকে যাচ্ছিল l অস্পষ্ট , ক্ষীণ শব্দ আসছিল, জ্যাঠামশাই সে শব্দ যেন কান পেতে শুনছিলেন l সে শব্দের বার্তার এক দিকে বেজে উঠছিল--যেতে নাহি দিব...অন্যদিকে যাবার নিশ্চিত একটা তাগিদ জ্যাঠামশাই স্পষ্ট যেন টের পাচ্ছিলেন l
সমাপ্ত

Sunday, 5 December 2021

প্রার্থনা--সন্ধ্যা রায়



প্রার্থনা 
সন্ধ্যা রায় 

অনেকেই বলে মনে কখনো অহংকার এলে একবার শ্মশানে ঘুরে আসবেন l আমার মনে হয় একবার হাসপাতালে যাওয়া সব চাইতে ভালো l ওখানে গেলে জীবনকে চেনা যায়, এখন ভালো আছি, কাল কি হবে? তা কেউ জানে না l সামনে নানা অনুভূতির জন্ম হয় যা নিজের চোখে দেখা যায়। নানা বিস্ময়কর অনুভূতির সমন্বয় ঘটে । --চলুন ম্যাডাম, আমি ধরে উঠিয়ে দিচ্ছি, বসুন হুইল চেয়ারে, আপনাকে এক্স-রে করাতে নিয়ে যেতে হবে-- 
নার্সের সাহায্য নিয়ে আমিও উঠে বসলাম, চললাম নার্সের সাথে, ভেতরে পৌঁছে দাঁড়িয়ে আছি। আমার আগের জনের এক্সরে হচ্ছে, তারপরই আমার চান্স । হঠাৎ এক ইমারজেন্সি পেশেন্ট এলো, তার নাকে নল, মুখে ব্যান্ডেজ, ইউরিনের টিউব-প্যাক্ লাগানো l মনে হল তার প্রাণটা নিমেষে উড়ে যেতে পারে, সব শেষ হয়ে যেতে পারে l দেখেই কেমন ভয় হচ্ছিল, ঠাকুর সবাইকে ভাল করে দিও--আমি দুহাত তুলে প্রার্থনা করলাম l একটা পঁচিশ ত্রিশ বছর বয়সের ছেলে, ওর জীবনের সব পড়ে আছে, আমার তো সব শেষ করে এসেছি, ইমারজেন্সি পেশেন্টের এক্সরে আগে নেওয়া হল l তারপর আমার সময় আসবে l 
এক্স-রের পরে আমি আমার নিজস্ব হসপিটালের ঘরটিতে চলে এলাম l এই সব দেখে আমি বড় ক্লান্ত, খাওয়া হল, আবার ড্রিপ চলল l আমি ঘুমিয়ে নিয়ে শান্ত হলাম l বিকেলে আবার আলট্রা সাউন্ড এর জন্য গেলাম l ওখানে কোন ভিড় নেই, আমার কি হয়েছে তখনও আমি জানি না l, আমার আল্ট্রাসাউন্ড চলাকালীন তা গুটিকতক স্টুডেন্টকে দেখানো হল l ডক্টর তাদের সামনে খুব শিক্ষামূলক ব্যাখ্যা করলেন হিন্দিতে আর ইংরেজিতে , তার এসব এখানে কিছু আমি দিলাম না l পরদিন আবার অন্য একজন নার্স তার সঙ্গে গেলাম সিটিস্ক্যান করাতে l অন্য দিনের মতই দাঁড়িয়ে আছি, কারো সিটিস্ক্যান চলছিল, সে বেরোলেই আমি যাব l ওখানে এক সুন্দরী মেয়ে, বছর পনের ষোলর হবে, ওর কি রোগ ছিল আমি জানি না l আমাকে দেখেই মেয়েটি আমার পাশে এল, জিজ্ঞাসা করল, তোমার কি হয়েছে গো ? আমি বললাম, জানি না কি হয়েছে l আমার আসলে এতকিছু বলার ক্ষমতাও ছিল না l আমি তাই এড়িয়ে গেলাম l আমাকে ও বলল, তুমি ভালো হয়ে যাও! আমার মার তো ক্যান্সার হয়েছিল, মারা গিয়েছে l আমি ওখানে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলাম l এত কষ্ট মেয়েটার! কি জানি কি হয়েছে ! 
আমি ভিতরে গেলাম, তারপর পঁয়ষট্টি বছর বয়সে আমার প্রথম সিটিস্ক্যান হল l আবার হসপিটালের নিজের রুমে চলে গেলাম l কিন্তু মনে হতে থাকলো, মেয়েটার মার ক্যান্সার ছিল , আমারও বায়োপসির জন্য গেছে, কি রিপোর্ট আসবে কে জানে? কখন যেন ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম l হাসপাতালের তাড়নায় ঘুম কিন্তু ভালই হয় l পরদিন রিপোর্ট বোধহয় এসে গিয়ে ছিল, সকাল থেকে জল খেতে দেয়নি, নিয়ে গেল ওটিতে l ওখানে গিয়ে দেখি এক সাড়ে তিন বছরের শিশু ওর সামনে টয়ট্রেন সাজানো l বেডের উপর খেলছে সে l মনে হল এই বাচ্চাটা এল কেন এখানে ? নার্সকে জিজ্ঞাসা করতেই বললো, ওর ব্রেন টিউমার l মনে মনে আমি , অবাক হলাম, এত ছোট বাচ্চার ব্রেইন টিউমার হয়? তখন  আমার মনে সারদা মা ও ঠাকুরের মুখটা ভেসে উঠলো l  
--তুমি তো আমাকে অনেক সুখ দিয়েছো, মা ! আমি পঁয়ষট্টি, এসেছি এই হাসপাতালে, এত ছোট বাচ্চার কি অপরাধ মা, কেন এমনি হল ! আমার চোখ থেকে জল বেরিয়ে এলো l আমি তাকিয়ে দেখি, শিশুটা অপলক তাকিয়ে আছে আমার দিকে l আমি নিজেকে সংবরণ করে একটা হাসি দিলাম--মায়ের উদ্দেশ্যে হাত উঁচু করে বারবার প্রণাম করলাম l বললাম, ভালো করে দাও এই শিশুটাকে--
আমি তো বয়সে বুড়ো হয়ে এসেছি আমি নিজের সব কষ্ট ভুলে যাব মা, ওকে ভালো করে দিও তুমি! যেন এই পৃথিবীর আলো বহুদিন সে দেখতে পায় l 
এম.আর.আই. হল l ভিড় নেই একদম--এক ঘন্টার উপরে সময় লাগলো l আজ আর মনকে নাড়া দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা নেই l ফিরছি রুমের দিকে, হঠাৎ কান্নার আওয়াজ এলো l সামনে দিয়ে, স্ট্রেচারে একজন ছেলেকে নিয়ে যাচ্ছে--দু জন স্ত্রীলোক একজন পুরুষ লোক কান্নায় ভেঙে পড়েছে l বুঝলাম, ছেলেটি মারা গেছে, মুখটা তার তখনও সাদা কাপড়ে ঢাকা হয়নি l মা বাবা আর স্ত্রী শেষ দেখার জন্য সুযোগ পেয়েছে l আন্দাজেই আমি বুঝে নিয়েছিলাম l আমি জানি না বা চিনি না--তবুও কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম মৃতদেহ দেখে l  নার্সকে বললাম, একটু , দাঁড়াও , আমি দুহাত তুলে প্রণাম করলাম মৃতের উদ্দেশ্যে--খুব সুন্দর ছেলেটাকে দেখতে l দেখে মনে হল যেন শ্রী  নারায়ণ সমুদ্র শয়ানে l আমার নিজের প্রতি ঘৃনা হল, আমি নিজের জন্য কাঁদি তার চেয়ে এই সব ছেলেদের আরও প্রাণ দিও, ঠাকুর, জীবনী শক্তি তাদের মধ্যে আরও দাও ঠাকুর ! এইসব প্রাণকে রক্ষা করো, আরো অনেক অনেক দিন এদের সময় দিও! কিছুই হয়নি জীবনে তার, হয়ত মাত্র শুরু করেছিল, এখানেই শেষ করে দিও না ঠাকুর l
সমাপ্ত

মানিকজোড়--সমাজ বসু



মানিকজোড়
সমাজ বসু

ছেলেদুটোর জ্বালায় অতিষ্ট রমা দেবী। বাড়িতে একাই থাকেন। ছোট্ট একটা বাগান লাগোয়া বাড়ি। ফুলের বড় শখ তাঁর। তার পেছনে তিনি অনেকখানি সময় ব্যায় করেন। ফলস্বরূপ বিভিন্নরকম ফুলে ভরে উঠেছে তাঁর বাগান। এছাড়া দুতিনটে পেয়ারা,আম আর বাতাবিলেবুর গাছও আছে। কিন্তু ওই বাঁদর দুটোর উৎপাতে গাছে না ফুল থাকে,না ফল। কখন যে ওগুলো নিয়ে পালায় টেরই পান না। 
--- হ্যারে বাসন্তী,ওই বিচ্ছু ছেলেদুটোর কি করি বল তো?আজ এটা ভাঙছে,কাল ওটা ভাঙছে। ফুল ফল নিয়ে পালাচ্ছে। আমার হাড়মাস এক করে ছাড়ল। 
--- দ্যাখো গিন্নিমা, আমার তো মনে হয় এবার তুমি পাড়ার কিছু বড়দের কানে কথাটা তোলো। তোমার পক্ষে ওদের শায়েস্তা করা সম্ভব নয়। তাই পূজোর পর দাদাবাবু এলে,এর একটা বিহিত করো।
--- হ্যা,এবার একটা কিছু করতেই হবে। এই তো কাল ভেবেছিলাম,আজ ঠাকুরকে একটা বাতাবিলেবু প্রসাদ দেবো। সকালে উঠে দেখি, চারটের একটাও নেই। মন খারাপ হয় কিনা বল? তুই ঠিকই বলেছিস,বাবলু এলে কিছু একটা‌ করতে হবে।

আজ মহাষষ্ঠী। শরতের ঝকঝকে তকতকে আকাশ। বাতাস জুড়ে মায়ের আগমনীর সুরধ্বনি।  এই মনোরম পরিবেশেও রমা দেবীর মন ভালো নেই। ছেলে ছুটি পায়নি। দশমীর আগে সে আসতেই পারবে না। এবার আর মায়ের মুখ দেখা হবে না। এইকটা দিন টিভিতেই দর্শন সেরে নিতে হবে। একটা কষ্ট তাঁর বুকে জাঁকিয়ে বসল।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নেমে এলো। পাড়ার পূজোমন্ডপ থেকে ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে। বারান্দা থেকে বড় রাস্তায় লোকজনের যাওয়া আসা দেখতে দেখতে রমাদেবী পূজোর গন্ধ অনুভব করতে লাগলেন। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল। পায়ে পায়ে নীচে নেমে এসে দরজা খুলতেই তিনি একেবারে অবাক। ভূত দেখার মত চমকে উঠলেন। দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে কালু আর রঘু। মানিকজোড়।
--- একি! তোরা এখন? কেন এসেছিস? কি চাই তোদের?
--- আমাদের কিছু চাই না ঠাকুমা। কাকু তো বাড়িতে নেই। তাই আমরা এসেছি, তোমাকে পাড়ার ঠাকুরগুলো দেখাব বলে। একটা রিকশাও নিয়ে এসেছি। কালু আর রঘুর কথা শেষ না হতেই,রমাদেবীর চোখদুটো ছলছল করে উঠল। তিনি পরম স্নেহে দুহাত দিয়ে দুজনকে কাছে টেনে নিলেন। সব কথা যেন তাঁর গলায় আটকে আছে।
--- নাও ঠাকুমা,এখন খুব তাড়াতাড়ি কাপড় পরে নাও দেখি। আমরা নীচে অপেক্ষা করছি। কালুর কথা শেষ হতেই রঘু সুর ধরল।
--- ঠাকুমা,পূজোমন্ডপে কিন্তু আমাদের আইসক্রিম খাওয়াতে হবে।
--- শুধু আইসক্রিম কেন? আজ তোরা যা খেতে চাইবি‌,তাই খাওয়াব। ওরে,আমি যে তোদের চিনতে পারিনি। আজ থেকে তোরা দুই মানিকজোড় আমার দুচোখের দুটো মণি হয়ে গেলি। সঙ্গে সঙ্গে ওরা দুজন একসঙ্গে ঢিপ করে রমাদেবীকে প্রণাম সেরে নিল।
পাড়ার পূজোয় তখন মায়ের আমন্ত্রণ শুরু হয়ে গেছে। একসাথে অনেক ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছে।

তনুশ্রী গুহ--" বন্ধুত্ব নাকি ভালোবাসা"



তনুশ্রী গুহ--"বন্ধুত্ব নাকি ভালোবাসা"

--তনুশ্রী গুহ

আজ রাহুলের ইউনিভার্সিটি-র ক্লাসের শেষ দিন। ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পর বাড়িতে বসে একটু ফেসবুক করছে রাহুল। চোখ পড়লো রাহুলের একটি মেয়ের প্রোফাইলে। যার নাম শ্রেয়া। রাহুলের খুব ভালো লাগলো সেই শ্রেয়া মেয়েটিকে দেখে। রাহুল ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠালো শ্রেয়াকে। তারপর সারাক্ষণ রাহুল শুধু শ্রেয়ার কথাই ভাবতে লাগলো। রাহুল খুব ভালো গান করে। মনে মনে শ্রেয়াকে কল্পনা করে সে গান করতে লাগলো এবং ভাবতে লাগলো যাকে সে চেনেনা, জানেনা তার জন্য আজ তার মন এতো ছটফট করছে কেনো! কি আছে শ্রেয়ার মধ্যে! এভাবে এক সপ্তাহ কেটে গেলো। রাহুল, শ্রেয়ার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্টের অপেক্ষায় রইলো। দুসপ্তাহ পর শ্রেয়া, রাহুলের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলো। তারপর আস্তে আস্তে দুজনের মধ্যে কথাবার্তা শুরু হল। শ্রেয়া, রাহুলের মধ্যে এক ভালো সম্পর্ক শুরু হল। দুজন দুজনের খুব কেয়ার করা শুরু করলো। এখনো কেউ কাউকে সামনা সামনি দেখেনি। এরপর দুজন দুজনের সাথে দেখা করার দিন ঠিক করলো। এরপর দুজনের একদিন দেখা হল। রাহুল, শ্রেয়াকে দেখে যেন চোখ সরাতে পারছিলোনা। এতোটা বেশি মন থেকে সে ভালোবেসে ফেলেছিলো শ্রেয়াকে। রাহুল খুব সরল ও সাদাসিধা ছেলে তাই খুব সাদাসিধা ভাবেই সে শ্রেয়ার সাথে দেখা করতে আসে। আর ওদিকে শ্রেয়া সাজতে খুব ভালোবাসে, ওর কাছে বাইরের লুকস -ই যেন সবকিছু। যাইহোক রাহুলকে সামনা সামনি দেখে এবং রাহুলের সাদাসিধা লুকস শ্রেয়ার ভালো লাগলোনা। কিন্তু সেটা সে রাহুলকে বুঝতে দিলোনা। দুজন দুজনের সাথে সেদিন দেখা করার পর রাহুল, শ্রেয়াকে বললো যে সে শ্রেয়াকে এখন আর শুধু বন্ধু মনে করেনা বরং তার জীবনসঙ্গী মনে করে। শ্রেয়া এটা শুনে একটা মুচকি হাসি দিলো। এরপর পরের দিন রাহুল, শ্রেয়াকে ফোন, এসএমএস করে কিন্তু শ্রেয়া, রাহুলকে ইগনোর করা শুরু করে। তারপর রাহুল, কারণ জানতে চাওয়ায় শ্রেয়া, রাহুলকে বলে, "আমরা ভালো বন্ধু, এর বেশি আর কিছুনা। আমি খুব তাড়াতাড়ি কোনো স্টাইলিশ সুন্দর ছেলেকে বিয়ে করবো"। রাহুল, কারণটা বুঝতে পারে এবং রাহুল খুব কষ্ট পায়। তারপর শ্রেয়ার বিয়ে ঠিক হয় অন্য একজনের সাথে। রাহুল, শ্রেয়ার কাছে গিয়ে খুব কান্নাকাটি করে। শ্রেয়া তখন রাহুলকে বলে, " তুমি যদি সত্যি আমাকে ভালোবাসো তাহলে আমার জীবন থেকে দূরে চলে যাও"। রাহুল খুব কষ্ট পায় এবং সেখান থেকে চলে যায়। এরপর শ্রেয়ার অন্যজনের সাথে বিয়ে হয়। বিয়ের ছ মাসের মধ্যে শ্রেয়া জানতে পারে যে শ্রেয়ার বর একজন ঠকবাজ মানুষ এবং সে আগে বিয়ে করেছে, এবং যত দিন যায় সে শ্রেয়ার ওপর অত্যাচার শুরু করে। এই অত্যাচার গুলো সহ্য করতে আর পারছিলোনা শ্রেয়া। বাধ্য হয়ে সে তার বাবার বাড়িতে চলে যায় এবং সব বলে। কিন্তু তার বাড়ি থেকে তাকে বলে শ্বশুর বাড়িতে ফিরে যাওয়ার জন্য এবং অ্যাডজাস্টমেন্ট করার জন্য। দিন দিন শ্রেয়ার ওপর তার বরের অত্যাচার বাড়তে থাকে এবং শ্রেয়ার জীবন দুর্বিষহ হয়ে যায়। আর এদিকে রাহুল জীবন সংগ্রাম, কষ্ট করে আজ একজন প্রতিষ্ঠিত গায়ক। আর রাহুলের লুকস এখন আর চেনাই যায়না, মেয়ে ফ্যান ফলোয়িং ভর্তি এখন রাহুলের। কিন্তু রাহুল এখনো শ্রেয়াকেই ভালোবাসে। কারণ সে যে মন থেকে ভালোবেসেছিলো শ্রেয়াকে। অবশেষে শ্রেয়া আর এই অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার শ্বশুর বাড়ি ছেড়ে চলে গেলো। কোথায় যাবে সে জানে না, কিন্তু আজ যেন সে নিজের সেই ভুল বুঝতে পারছে যা সে রাহুলের সাথে করেছিলো। শ্রেয়া, রাহুলের কাছে গেলো। রাহুলের কাছে ক্ষমা চাইলো শ্রেয়া এবং বললো যে তার জীবনে এখন আর কিছু নেই, তাই সে আর কি করবে এখন কোনো আশ্রমে গিয়ে থাকবে। এই বলে শ্রেয়া যখন সেখান থেকে চলে যাচ্ছিলো তখন রাহুল, শ্রেয়ার হাত ধরে বললো, "শ্রেয়া, আমি আজও শুধু তোমাকেই ভালোবাসি। আমি থাকতে তুমি কোথাও যাবেনা। আমি জানিনা আমাদের সম্পর্কটা তোমার কাছে এখনো বন্ধুত্ব নাকি ভালোবাসা, কিন্তু আমার কাছে তুমি আমার সবকিছু"। এটি শুনে শ্রেয়া কেঁদে ফেললো এবং রাহুলকে জড়িয়ে ধরলো। এরপর শ্রেয়ার তার বরের সাথে ডিভোর্স হয়। আজ রাহুল আর শ্রেয়ার বিয়ে। রাহুলের সত্যিকারের ভালোবাসা ও অপেক্ষা অবশেষে জয়ী হল।।

মনোবেদনা তপন তরফদার

মনোবেদনা
তপন  তরফদার
 

অবশেষে আমার মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়েছে। ডাক্তারি পড়ার সুযোগ পেয়েছি, হোস্টেলেও ঘর  পেয়েছি। র‍্যাগিং পর্ব শেষ, এখন সবাই আমরা প্রাণের বন্ধু। অন্যের বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়তে কোনো দ্বিধা নেই। সবাই মন খুলে আড্ডা মারি। ব্যতিক্রমী ওই  সুপ্তি গুপ্তা  এম.ডি. পড়ছে।  গম্ভীর মুখ  পরনে কালো ইঞ্চি পাড় সাদা শাড়ি সঙ্গে ধবধবে সাদা ব্লাউজ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। বছর পঁচিশের মেয়ে এরকম পোশাক নিয়ে নানা গালগল্প আমাদের মধ্যে চালু। গুপ্তাদি  কিন্তু  কাউকেই পাত্তা না দিয়ে  নিজের মত থাকে। একটা  অঘটন ঘটে গেল  তৃতীয় বৎসরের ছাত্রী মৌসুমী করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। আমরা এমন কি ওর পরিজনবর্গ  শেষ দেখা দেখতে পায়নি। সবার মনেই দুঃখ এবং ক্ষোভ। আমাদের উপযুক্ত পোশাক পরিচ্ছদ  ছাড়াই পরিষেবা দিতে হচ্ছে।অনতিবিলম্বে এর প্রতিবিধান চাই। ঠিক হলো ওর স্মৃতি সভাতেই বিষয়টি কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করা হবে। এই দুঃসময়ে আমরা সরব না হলে জনসাধারণ ভালো চোখে দেখবে না।

            সুপ্তিদিও এসেছেন মৌসুমীর শোক সভায়। যদিও শোক সভা,সভার শুরুতে গান পরিবেশনের রীতি আছে। গান কে গাইবে ঠিক করা হয়নি। সম্পাদক অনুরোধ করলো যদি কেউ এগিয়ে এসে গান  গেয়ে অনুষ্ঠান শুরু  করতে সাহায্য করে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে সুপ্তিদি  খালি গলায় গান  ধরলেন, “আমার প্রাণের পরে সে চলে গেল.......    বলে গেল না সে কোথায়  গেল  ফিরে এলো না” সভা নিস্তব্ধ শোকাহত। প্রত্যকেই অবাক এমন গান শুনে। সুপ্তিদি কিন্তু  কাউকেই কোনো আলাপনের সুযোগ না দিয়ে  নিজের ঘরে চলে গেলেন।

লকডাউন দুদিনের জন্য তুলে নেওয়া হয়েছে। হোস্টেল একদম ফাঁকা, সূর্যাস্ত শুরু  হয়ে গেছে। আমি ডাইনিং হলে এসে  দেখি চা হয়নি। সুপ্তিদি ও চা খেতে এসেছেন। এক লহমায় পরিস্থিতি বুঝে গিয়ে  নিজেই কিচেনে ঢুকে হিটার জ্বালিয়ে  ছোট্ট একটা অ্যালুমিনিয়ামের বাটিতে জল ঢেলে  আমার দিকে তাকিয়ে বলে  তুই চা খাবিতো। আমার শরীরে এক শিহরণ।মাথা কাত করে বললাম, আমি সাহায্য করবো। সুপ্তিদি বলে কি এমন কাজ, তোর সাহায্য নিতে হবে। পাকা হাতের চা। টেবিলে বসে দুজনে চুমুক দিচ্ছি। হলঘর  শুনশান। সূর্য অনেক আগেই ডুবে গেছে, হস্টেলের আলো এখনো জ্বালানো হয়নি। একটা  রহস্যময় পরিবেশ। এই পরিবেশেই রহস্যময়ী আমার খোঁজ খবর নিল। আমি প্রশ্ন করার আগেই বলল, জানি আমাকে নিয়ে  তোদের অনেক  কৌতূহল। তোকেই বলবো, অন্য কাউকে  বলিসনা। ডিনার করে আমার ঘরে আসিস।

দরজায় টোকা মারতেই দরজা খুলে সুপ্তিদি আমাকে ধবধবে সাদা সাদা চাদর পাতা বিছানায় বসতে বলল। আলনায় একই ধরনের সাদা শাড়ি,সাদা এয়ারহোস্টেস ব্লাউজ। টেবিলের মাঝখানে এক যুবকের হাসিমুখের ছবি। ফটোর সামনে ফুলদানী তে সাদা ফুল। আমার  প্রেমিকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। আমরা অনেকের থেকে  প্রেমে এগিয়ে থাকতাম। বিয়ে না হলেও দুজনে “ওইক এন্ডে” বেড়াতে যেতাম। বুদ্ধপূর্ণিমায় শঙ্করপুরে গিয়ে ছিলাম। মধ্য যামিনীতে নির্জন উন্মুক্ত সমুদ্রতটে ফুলশয্যা করে বায়না ধরে ওই রূপো ঝরা জোৎস্নার ধারায় নির্মল সফেদ সমুদ্রের ফেনায় মৎস্যকন্যার সঙ্গে জলকেলি করবে। আমার  নিষেধাজ্ঞাকে ফুৎকারে উড়িয়ে আমাকে  পাঁজা কোলা করে ঢেউয়ের সামনে চলে আসলো। পূর্ণিমা রাতে তাজমহল দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছে,তারাই উপলব্ধি করতে পারবে পূর্ণিমা রাতে শঙ্করপুরের সমুদ্র। মিনিট পাঁচেক হুটোপুটি করার পর  রাহুলকে দেখতে না পেয়ে  চিৎকার করতে থাকি রাহুল  রাহুল বলে। কোন  লাভ  হয়না। নোনতা বাতাসই সারাগায়ে ছুঁচালো হয়ে বিঁধতে থাকে। সমুদ্র ওকে ফেরত দেয় ঠিক দুদিন বাদে,সেই জায়গায়।

         সুপ্তিদি থামল, আর ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণেই লোডশেডিং হলো। সুপ্তিদির মুখটা অন্ধকারেই মিলিয়ে গেল। কান্নাভেজা কন্ঠের কথা, আমার  উচিত ছিল ওকে বাধা দেওয়ার। সরা জীবন ধরে  থেকেই যাবে আমার এই আপশোষ।

অসিত কুমার পাল--মা ও ছেলের অদ্ভূত ভালোবাসা

অসিত কুমার পাল

মা ও ছেলের অদ্ভূত ভালোবাসা 
****************************

রমা অনেকদিন পরে বাবার বাড়িতে এসেছে ।  অবশ্য কয়েক বছর আগে বাবা মারা গেছে । একমাত্র ভাই রমেশ চাকরী পেয়ে পুনেতে চলে যাওয়ায় মা বাড়িতে একাই থাকে , নিজেই রান্না করে খায় ।

 রমা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করল তার মা প্রতিদিনই অনেকটা সময় নিয়ে দুপুর বা রাতের খাবার তৈরি করে ।  রোজই নতুন নতুন পদ রান্না করে ।  রান্না শেষ হলে নিজে খাওয়ার আগে  মা খুব যত্ন সহকারে সেদিনের খবরের কাগজের প্রথম পাতার পাশে রান্না করা ভাত বা রুটির ছাড়াও ডাল তরকারি চাটনি ইত্যাদি সাজিয়ে রাখে । তার পরে সেসব খাবারের ছবি তুলে হোয়াটসএপ করে রমেশের কাছে পাঠিয়ে দেয় ।

 কয়েকদিন ধরে একই রুটিন দেখার পরে কৌতুহল বশত রমা জানতে চাইল - মা, রোজ খাওয়ার আগে এভাবে ফটো তোলাটা কি তোমার অভ্যাস হয়ে গেছে ?

 মা বলল - আর বলিস না । বেচারা রমেশ তো  চাকরীর জন্য পুনেতে থাকে  । সেখানকার হস্টেলের খাবার নাকি একেবারে অখাদ্য । রমেশই আমাকে  বলেছে - রোজ দুবেলা খাওয়ার আগে আমি যদি ভালো মন্দ খাবারের ছবি তুলে পাঠাই তাহলে সেই ছবি দেখে ওখানকার অখাদ্য খাবারগুলো খেতে  তার  নাকি ভালো লাগবে ।

 রমা অনুযোগ করল - মা, তুমি ওকে আদর দিয়ে বাঁদর করে তুলেছ । ও এখন বড়ো হয়ে গেছে ,   তবুও বাচ্চাদের মত তোমার কাছে আবদার করে চলেছে । তুমি ওর কথায় কান দাও কেন ? মা কিছু না বলে একটুখানি হাসল ।

রমা একটু পরে রমেশকে  ফোন করে অভিযোগ করল -   ভাই তুই, মাকে এত খাটাচ্ছিস কেন ?  তোর আবদার রাখতে মাকে রোজ  নতুন নতুন রান্না করতে হচ্ছে, ছবি তুলে হোয়াটসএপ করতে হচ্ছে । ওত দূরে থেকেও মাকে না জ্বালালে তোর  কি খাবার হজম হয়  না ?

 রমেশ  খানিকটা হেসে নিল । তারপরে বলল - নারে দিদি, এমন কোন কথা নয় । আমি  মাকে জ্বালাচ্ছি না ।
আসলে  বাবার মৃত্যু, তোর বিয়ে আর আমি চাকরী নিয়ে পুনেতে চলে আসার পরে মা খুব একা হয়ে গেছে ।

 গতবার যখন বাড়িতে গিয়েছিলাম, তখন কাজের মাসিমা বলল মা প্রায় দিনই কিছু রান্না করে না । হয়তো চায়ের সঙ্গে পাউরুটি খেয়ে নেয় নয়তো শুধুই খিচুড়ি । সারা দিন চুপ চাপ বসে থাকে ।

 মা যাতে রোজ রান্না করে , সেজন্যই আমি এই মতলব বের করেছি । আমাকে ফটো পাঠানোর জন্যই মা রোজ নিত্য নতুন রান্না করে । আর খেয়েও নেয় । আর রান্নাতে ব্যস্ত থাকে বলে মা ততটা নিঃসঙ্গতাও অনুভব করে না ।

ভায়ের জবাব শুনে রমার চোখ জলে ভরে গেল । সে রুদ্ধকন্ঠে বলতে পারল - ভাই,  যতটা ভেবেছিলাম তুই তার থেকেও অনেক বড় হয়ে গেছিস । তোর মত সবাই এমন করে মায়ের কথা ভাবতে পারে না ।

------------_------------

Saturday, 4 December 2021

স্ত্রী-- তৈমুর খান


স্ত্রী
💔

 তৈমুর খান



 ভোর থেকেই ডাক্তারখানায় মানুষের আনাগোনা। সকাল ৭-টা হলে একজন কর্মচারী কাগজ-কলম নিয়ে এসে হাজির হন। হাঁক দিয়ে বলেন: যারা ডাক্তার দেখাতে এসেছেন, তারা একে-একে নিজের নাম ও ঠিকানা বলুন এবং ফিজের ৭০০-টাকা জমা দিন।

   তখন বেশ হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। কে কার আগে নাম লেখাতে পারবে তারই প্রতিযোগিতা।

    আমি সবার আগে এসেও পারলাম না। আমার সিরিয়াল হল ৩০,অর্থাৎ সবার শেষে। রাত দুটোতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ডাক্তার দেখিয়ে বাড়ি ফিরতে হয়তো সন্ধ্যে হয়ে যাবে। তা হোক, কী আর করা যাবে! চায়ের নেশা। ঘনঘন চা খেয়েই সারাদিন কাটিয়ে দেবো।

   সারাদিন মানে! সারাজীবনই তো কেটে গেল!

 কয়েকটা কবিতার বই, চাকুরীবিহীন দুটি সন্তান-সন্ততি এবং রোগা-পটকা একটা স্ত্রী। সংসার কোনোদিন সচ্ছল হয়েছে? থাক সেসব কথা। পৃথিবীতে আর ক'টাদিনই বা আছি! হার্ট অ্যাটাক হতে হতে একবার ফিরে এলাম। আজ তারই চেকআপের দিন। সঙ্গের লোকগুলো একে একে সবাই চলে গেল। আমিও যাবার জন্য পথের মাঝখানে।

     দূরে কী একটা পাখি ডাকছে: মেঘ হোক! মেঘ হোক!

     হায়রে মেঘ! কত মেঘই না দেখলাম! কত বৃষ্টিতে ভিজলাম। কত বজ্রবিদ্যুৎ চোখ রাঙাল। বৃষ্টিভেজা নারীশরীর নিয়ে কত কবিতাই না লিখলাম। কত নক্ষত্র ফুটল। কত অদৃশ্য রূপসী উড়ে গেল মাথার ওপর। দোকানের এক কোণে বসে বসে কত কথাই মনে পড়ছে। কাগজ-কলম থাকলে এসব নিয়ে কবিতাও লেখা যেত। দুপুর গড়িয়ে গেছে। কত নম্বর সিরিয়াল চলছে গো?

      পাশ থেকে একজন বলল: ২৭ নম্বর।

     —তাহলে তো আমাকে এবার তৈরি হতে হবে!

      লোকটি বলল: একজন বিধবা ভদ্রমহিলা এসে খুব কাকুতি-মিনতি করছে ডাক্তার দেখাবে বলে, কিন্তু ডাক্তার ৩০-এর বেশি রোগী দেখবেন না।

 —কে ভদ্রমহিলা?

 কথা শুনেই দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখি এলো চুলে দাঁড়িয়ে আছে অর্জি। হ্যাঁ ঠিকই, অর্জি বেগম!

      তখন সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি। অর্জির দাদা আমার সহপাঠী। নানা ছুতোয় ওদের বাড়ি যেতাম শুধু অর্জিকে একঝলক দেখার জন্য। ওরকম বড় বড় চোখ, কোমর পর্যন্ত লম্বা চুল, দুধে-আলতা রং কতই-না ভাললাগত। খুব অল্পদিনেই ওর প্রেমে পড়ে গেলাম। যেমন করেই হোক অর্জিকে পেতে হবে। একটাই লক্ষ্য। একটাই সংকল্প। যেদিন পুকুরঘাটে ভেজাকাপড়ে ওকে স্নান করতে দেখতাম, কিংবা ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে বৃষ্টি পড়লে যখন ও খুব ছুটত, তখন আমার মনটা অস্থির হয়ে উঠত। ওর শরীরের লোভনীয় অংশগুলি যেন আকুল হয়ে ডাকত আমাকে। একখণ্ড শরীর কাপড়ের ফাঁকে জ্বলজ্বল করে উঠত। মনে হত ঐশ্বরিক আলোর বিভা। আমিন চমৎকৃত হতাম। তাকে নিয়ে স্বপ্ন বেড়েই চলল। সেই অর্জি আজ বিধবা!

       মনে মনে আমিই তো কবেই তাকে বিয়ে করে নিয়েছিলাম, কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। আমি তখন বিএ ক্লাসের ছাত্র। গরীব ঘরের সন্তান সব প্রস্তাব এককথায় নাকচ করে দিয়ে ওর বাবা বলেছিল: বামন হয়ে চাঁদে হাত!

      তারপর ভিন্ন জেলার এক গেরস্থ বাড়িতে ধুমধাম করে বিয়ে দিয়েছিল অর্জির। শুনেছি তিন মেয়ে তার। দুটির বিয়েও হয়ে গেছে।

        ছুটে এসে হাত ধরল অর্জি। কোনো ভূমিকা না করেই বলতে লাগল: তৈমুরদা, আমি ক'দিন থেকে খুব অসুস্থ। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছি। আমাকে ডাক্তার দেখাবার ব্যবস্থা করে দাও। ঠিক সময়ে আসতে পারিনি।

     বহুদিন পর তোমাকে দেখছি অর্জি! তোমার এরকম চেহারা দেখব ভাবিনি! ঠিক আছে এসো।

 ডাক্তারের চেম্বার থেকে ডাক এলো: সিরিয়াল ৩০, তৈমুর খান!

 —এইযে আসছি!

 —মেয়েটি কেন? একে তো ফিরিয়ে দিলাম!

 —আজ্ঞে! নামটি আমিই লিখিয়েছিলাম আমার স্ত্রীকে দেখানোর জন্য!

    ডাক্তার অনেকক্ষণ মুখের দিকে চেয়ে রইলেন আমাদের।

শেষ বিকেলে---সাবিত্রী দাস




শেষ বিকেলে
          সাবিত্রী দাস 


 সবাই  অবাক হয়ে যাবে । শুধু অবাকই  বা কেন নিন্দা- মন্দও কম হবে  কিছু! আর কিছু না হোক ছি ছি  করার লোকের তো আর অভাব  নেই এ সংসারে! তবে কিনা  আশ্চর্য  হলো এটাই যে সাতান্ন বছর বয়সী কমলা প্রেমে পড়েছেন। তাও কিনা ফেসবুক করতে গিয়ে। তা একটু আশ্চর্যই বটে! বিশেষতঃ এই  বয়সী মহিলাদের  পক্ষে! সময় কাটাতে ফোনে  ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলে দিয়েছিল বৌমা রমা,  তা সেখানেই আলাপ! জীবনের  বিচিত্র অভিজ্ঞতা,  রোমাঞ্চকর অনুভূতির
 কথা ভাগ করে  নিতে নিতে, দুজনের একাকীত্বের অনুভূতি কাটতে লাগলো। ভদ্রলোক থাকেন দুর্গাপুরে,সেখানেই কেটেছে চাকরি জীবন ,এখন অবসরের সময়। অকৃতদার মানুষ, রঙ তুলির  আঁচড়েই সময় কাটিয়ে দেন তিনি। 
 কলকাতায় এলে মাঝে মধ্যে,  দেখাও হয়  বৈকি !
         যে মানুষটা  মাত্র দুবছর  একসাথে কাটিয়ে তিরিশ বছর আগেই চলে গেছেন, তার কথা মনে করে নিজের মনকে প্রতিরোধ করতে অনেক চেষ্টাও করেছিলেন ,সেই স্মৃতিগুলোও এতটাই ঝাপসা  সময়ের বিবর্তনে যে  শেষ বিকেলের আলোটুকুকে আটকানো গেল না কোনোমতেই। 

         জীবনের অপরাহ্ন বেলায়  রথীনবাবুর হঠাৎ আগমনে জীবনটাই আমূল বদলে গেছিল। বদলে যেতে  থাকলেন ক্রমশ!   এক জীবনেই যেন জণ্মান্তরের অনুভূতি!  প্রেমের  কথা এতদিন  কেবল শুনেই এসেছিলেন  ,এখন টের পেলেন হাতে নাতে। বুকের ভেতরটায় যে কদম ফুল ফুটে ওঠার  সৌরভ! কেমন  একটা ঘোরের  মধ্যে সময় কাটতে লাগলো।   পরিবর্তন   চোখে  পড়লো  বৌমা রমার! তার চোখ  এড়ানো  কঠিন। সে একদিন  দুপুর বেলায় একটু একটু করে  সমস্তটা জেনে নিল  কবে, কেমন করে  আলাপ, পরেই বা দেখা হতো কিভাবে।রথীনবাবুর  সম্পর্কেও জানতে চাইলে বললেন কমলাদেবী রথীনবাবুর  একাকীত্বের  কথা, তার শিল্পী জীবনের কথা! বলতে বলতে  দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল , বৌমা জিজ্ঞাসা  করলো রথীনবাবুর সাথে থাকতে পারলে তিনি সুখী হবেন কি না! ওনাকে ছেড়ে  থাকতে  কমলাদেবীর কষ্ট হয় কি না। চোখ নামিয়ে নিলেন কমলাদেবী , এতেই যা বোঝার বুঝে নিলো ! সবটুকু শুনে বৌমা সাহস দিয়ে বলল রথীনবাবুর কাছে গিয়ে থাকতে । সেদিন রাতেই  রমা স্বামীকে বললো  'বাবার মৃত্যুর পর মা তোমাকে বড়ো করে তোলার জন্য অনেক  কষ্ট করেছেন। তার অনেক ত্যাগ স্বীকারের মধ্য দিয়েই  তোমার বড়ো হওয়ার রাস্তা প্রশস্ত হয়েছে। এখন  সময় হয়েছে মায়ের নিজের জীবন নিয়ে  ভাবার। মা তার  জীবনে সঙ্গী খুঁজে পেয়েছেন। কারোর আপত্তি থাকার কথা নয়।' ছেলে চুপ, মুখ দেখে মনের ভাব বোঝা কঠিন!  ছেলের পক্ষে এমনটা ভাবাই কঠিন,আত্মত্যাগী মাকে দেখেই তৃপ্তি পেতে চায় ছেলের মন।  তাই তার যে খুব একটা সম্মতি থাকবে এমন নয় কিন্তু বৌমাটি ভারি বুদ্ধিমতী  আর বিচক্ষণ। 
পরদিন  ছেলেও সম্মতি জানালো। বৌমা যাবে সাথে, রথীনবাবুর সাথে দেখা করতে চায় । যত্ন করে  বৌমা ব্যাগ   গোছাতে লাগলো।  বাজারে গিয়ে কমলা রথীনবাবুর পছন্দের কটা জিনিসও চুপিচুপি কিনে এনেছেন সবার অলক্ষ্যে । আগামীকাল সকাল সাতটায় ট্রেন। সকাল দশটার মধ্যেই  পৌঁছে যাবেন। রথীনবাবুকে  বলেছেন  স্টেশনে  আসতে।

            কখন থেকে স্টেশনে ঠায় বসে আছেন,সময় যেন আর কাটতেই চাইছে না।বারবার মোবাইল বের করে  সময়  দেখছেন ।
আরে দশটা বাজতেই  দেরী আছে দেখছি। মাথা টাথা খারাপ হলো নাকি! হেসে উঠলেন নিজের মনেই , কমলার আসবার কথা শুনে তিনি এতটাই উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন যে সময়টাও গুলিয়ে ফেললেন!  সময় কাটানোর জন্য উঠে পায়চারি করতে শুরু করলেন। পায়চারি করছেন আর ভাবছেন  যা ঘটতে যাচ্ছে তাকি সত্যিই নাকি স্বপ্ন দেখছেন।  তার পক্ষে  যে কল্পনা করাও অসম্ভব  ছিল।সেই অসম্ভবটাই আজ সম্ভব হতে চলেছে ,আমার কল্যাণে। 
 দশটা  পনেরোতে  ট্রেনটা এসে থামলো । ট্রেন থেকে নেমে এদিকেই আসছে, পাশের মেয়েটিই বোধকরি  বৌমা!  কাছে আসতেই পা ছুঁয়ে প্রণাম করতেই আশীর্বাদ করলেন । আবার বলে কিনা 'মাকে দিতে এলাম।'
বললেন রথীনবাবু-'চলো বাড়ীতে,যদিও বড়োই অগোছালো ঘর আমার ।' হাসছে বৌমা,বলল 'না আজ নয়,এখুনি ফিরতে হবে।  সবাইকে নিয়ে আসবো নাহয় আরেকদিন। ঘর গোছানো হোক মা তো এসেই গেলেন। '
      ট্রেনে  উঠে হাত নাড়ল রমা,ট্রেন ছেড়ে যাচ্ছে। যতদূর দেখা সম্ভব তাকিয়ে রইলেন,  কমলাদেবীর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়া জলে  ভিজে যাচ্ছে বুকের ভেতর পর্যন্ত । 

                     ********

বেদনার বালুচরে--শংকর ব্রহ্ম




বেদনার বালুচরে

শংকর ব্রহ্ম

-----------------------

গল্প হলেও সত্যি।  এটা কোন গল্প নয়। বাস্তবের এক মর্মান্তিক করুণ কাহিনী।

                    নজরুলের জীবনের শেষ চৌত্রিশবছর ছিল মর্মান্তিক । অনেক অবহেলা আর বঞ্চনার শিকার হয়েছিলেন তিনি।

         ১৯৪২এর ৯ই আগষ্ট থেকেই কবি অসুস্থ হয়ে পড়েন । তখন তিনি আক্ষরিক অর্থেই কপর্দকশূন্য । সংসারে দুই শিশুপুত্র , পক্ষাঘাতগ্রস্ত স্ত্রীপ্রমীলা , শাশুড়ি গিরিবালা । ১৭০০ গানের রেকর্ডে লক্ষ লক্ষ টাকা মুনাফা করেও গ্রামোফোন কোম্পানী তার কোন রয়ালটি দেননি ,তাঁর লেখার প্রকাশকরা ফিরেও তাকাননি। 

কবির অসুস্থতার কারণ , ‘নবযুগ’ সম্পাদনা কালে একবার কবি উত্তরপাড়ার এক অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় , একদল  দুষ্কৃতিদের দ্বারা প্রহৃত হয়েছিলেন , তাঁর ঘাড়ে ও মাথায় কঠিন আঘাত লাগে।  নির্বাক কবি যখন বাংলাদেশে (১৯৭২), তাঁর চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিকেলবোর্ড, কবির ঘাড়ের পুরাতন কঠিন আঘাতের চিহ্নটি সনাক্ত করেছিলেন ।
তার একবন্ধু জুলফিকার হায়দার খবরের কাগজে প্রচার করে দেন নজরুল ‘উন্মাদ’ হয়ে গেছেন । 
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের আর্থিক সহায়তায় কবিকে স্বাস্থ্য উদ্ধারের জন্য মধুপুর পাঠানো হল ১৯৪২-এর ১৯ শে জুলাই , কিন্তু অর্থ শেষ হয়ে যাবার পর কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয় ২১শে সেপ্টেম্বর । ১৯৪৪-এর ২৪শে মে আনন্দবাজার পত্রিকার ‘কবি নজরুল পীড়িত’ শিরোনামে একটি আবেদন প্রচারিত হয়। 
এরপর কয়েকটি সাহায্য সমিতি গঠিত হয় । কলকাতার সুখ্যাত চিকিৎসকেরা কবিকে দেখেন একাধিকবার , কিন্তু নিরাময়ের কোন লক্ষণ দেখা যায় না । কবি কাজী আবদুল ওদুদের উদ্যোগে গঠিত ‘নজরুল নিরাময় সমিতি’র উদ্যোগে কবিকে রাঁচির মানসিক চিকিৎসালয়ে পাঠানো হয় ১৯৫২র ২৫শে জুলাই । কিন্তু চারমাস চিকিৎসাধীন থেকেও তাঁর কোন উন্নতি না হওয়ায় ফিরিয়ে আনা হয় কলকাতায় । পরের বছর ১০ই মে ১৯৫৩ কবিকে নিয়ে যাওয়া হয় লন্ডনে। সেখানকার চিকিৎসকেরা মতপ্রকাশ করেন যে কবির ব্রেন কুঁকড়ে গেছে অর্থাৎ মষ্টিস্কের সংকোচন হয়েছে । লন্ডন থেকে ১০ই ডিসেম্বর নজরুলকে নিয়ে যাওয়া হয় ভিয়েনায় । সেখানেও চিকিৎসকের অভিমত ছিল কবিকে আর সুস্থ করে তোলা যাবে না । এরপরেও পূর্ব জার্মানীর বন বিশ্বিবিদ্যালয়ের ছাত্ররা এক রুশ ডাক্তারকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়েছিলেন । তাঁর অভিমত ছিল যে অনেক দেরি করে রোগীকে আনা হয়েছে। সাতমাস বিদেশে বৃথা চেষ্টার পর কবিকে ফিরিয়ে আনা হয় কলকাতায় ১৯৫৩-র ১৪ই ডিসেম্বর ।
এর পরেও তেইশ বছর জীবিত ছিলেন নজরুল। অভাবের তাড়না , মানসিক কষ্ট , নিঃসঙ্গতা , পরিচিত বন্ধুদের দূরে চলে যাওয়া , অবহেলা এসবই ছিল কবির শেষ জীবনের সঙ্গী । পশ্চিমবঙ্গ সরকার কর্তৃক বিনা ভাড়ায় থাকার জন্য ফ্ল্যাটের বন্দোবস্ত ও দুইবাংলা থেকেই লিটারারি পেনশনের ব্যবস্থা হওয়ার পর কিছুটা স্বস্তি এসেছিল । ১৯৬২র ২৩শে জুন স্ত্রী প্রমীলার দেহাবসান পর , কবি আরও ভঙে পড়েন।
জীবনের শেষ চারটি বছর কবি বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় অতিথির মর্যাদায় তাঁর প্রাপ্য সমাদর পেয়েছিলেন। 
মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় কবিকে সমাহিত করেন বাংলাদেশ সরকার।
তারাই মৃত্যুর পর তাঁকে 'জাতীয় কবি' হিসাবে সম্মানিত করে কবিকে যোগ্য মর্যদা দিয়েছেন বলে আমার মনেহয়।

-----------------------------------------------------------------

অদ্ভূত আঁধার এক...শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার




অদ্ভূত আঁধার এক....
*******************
শ‍্যামাপ্রসাদ সরকার 

দু'ঘন্টার ওপর এখন কারেন্ট নেই। রাতের খাবারটা ঢাকা আছে টেবিলের একপাশে। ওটা আর বোধহয় আর কাজে লাগবেনা। একটা দেশী মদের বোতল শেষ হয়ে গিয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে, ছড়িয়ে আছে ছোলা বাদামের খোসা, একটা কাঁপাকাঁপা শিখায় জ্বলছে মোমবাতিটা।

কাল ভোরেই হয়তো একশো কোটি'র ওপর আর একটি নতুন শিশুর জন্ম হয়ে সেই সংখ‍্যাটা  বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ওই সদ‍্যোজাত শিশুটি হবে জারজ ও মানসিক ভারসাম‍্যহীন এক মানবীর গর্ভজাত। জেলখানার হাসপাতালে  জন্মের মুহূর্ত থেকেই অন্ধকার পাপ আর তার নিষ্ঠুর আলিঙ্গন ওকে দিতে চলেছে ঘৃণা আর যৌনতাড়নার নিচ্ছিদ্র শৈত‍্য।

মিতালী 'সন্তান! সন্তান!'  করে খেপে উঠেছিল। ওর স্বামী রূপমকে নিজেই  জোর করে ফার্টিলিটি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়ে দুজনেই টেস্ট করায়। রূপমের অ‍্যাজোস্পার্মিয়া ধরা পড়ায় যতোটা হিংস্র হয়ে উঠেছিল মিতালী, ততোটাই স্বাভাবিক জীবন থেকে গুটিয়ে গিয়েছিল রূপম। 
*********
সেদিন সন্ধেবেলা ছিল ওদের বিবাহবার্ষিকী। সকালে মিতালী ডিনারে নেমন্তন্ন করল ফোন করে। মিতালী ভাল রান্না করে বরাবর। মাটন ভূনা আর পরোটা তার সাথে চিকেন তন্দুরী সহযোগে ব্ল‍্যাক লেবেল। রূপমটা কখনোই  খুব বেশী মদ খেতে পারত না। সেদিন কেন জানি না ও চারটে পেগ নামিয়েই  হাই হয়ে গেল। হঠাৎ মিতালীর নাম ধরে  আমাকে নোংরা খিস্তি করতে লাগল ওর সামনে । মিতালী একবারও কিন্তু ওকে বারণ করতে এল না! আমিও নেশার ঝোঁকে  রেগে গিয়ে টেবিলে রাখা একটা পেতলের ঘন্টা তুলে রূপমের মাথায় দুম্  মেরে বসলাম। দরদর করে রক্ত পড়তে লাগল রূপমের মাথা থেকে। তারপর অবসন্ন হয়ে কৌচে এলিয়ে বসতেই মিতালী দৌড়ে এসে বেডরুম থেকে একটা বালিশ এনে রূপমের মুখে চেপে ধরল। দশটা মিনিট! ব‍্যস্! রক্তাক্ত রূপম তারপর একটা লাশে জাস্ট পরিণত হল। খাওয়াদাওয়া যে আর হলনা, বলাই বাহুল‍্য। 
**************
তারপর....তারপর মিতালী একটা নীচ নোংরা নাটকের যবনিকা পতনের আগের দৃশ‍্যের মত আমাকে হাত ধরে টেনে ওদের বেডরুমে নিয়ে গিয়ে হিংস্র বাঘিনী যেমন করে তার শিকারকে ছিন্নভিন্ন করে ঠিক তেমন করেই পাপ  আর লালসার আঁচড়ে আমার শরীরটাকে ক্ষতবিক্ষত করে  ওর অবদমিত সন্তানকামনা চরিতার্থ করছিল মিতালী.....

********
পুলিশের কাছে যখন মিতালী ধরা দিল তখন ও সম্পূর্ণ মানসিক ভারসাম‍্যহীন। মামলা গড়াতে গড়াতে তিন চার মাসে ওর শাস্তি ওর হলনা ঠিকই কিন্তু প্রেগন‍্যান্সীটা শরীরে ততোক্ষণে স্থিতু  হয়েছে। আমি দেখতে যেতাম জেল হাসপাতালে  দু একবার। নির্বাক, উদাসী মিতালী চুপ করে বড় বড় চোখ মেলে আমায় দেখত আর ওর স্ফীত উদরটা মাঝেমধ‍্যে স্পন্দিত হয়ে আমায় ওই রাতটার কথা মনে করিয়ে দিত।
***********
এখন স্লিপিং পিলের পুরো পাতাটা খালি। দেশী মদ তার উপর আগুন জ্বালাচ্ছে গরলের। রূপমকে আমি খুন করতে চাইনি, কিন্তু তাও আমিও খুনী । আমি কি মিতালীকে আটকাতে পারতাম না? নীল শিফনের ফাঁক দিয়ে মিতালীর ফর্সা ধবধবে  বিভাজিকা কি আমায় পাপের ইন্ধন যোগায় নি একবারও?

 আমি অন্তত আজীবন আমার সন্তানের দিকে যেমন চোখ তুলে তাকানোর সাহস দেখাতে পারবনা তেমনই কখনো ওকে সন্তানের স্বীকৃতি দিয়ে একটা সুস্থ ভব‍্য জীবনও দিতে অপারগ।

তাই আমি আজক‍ের পর থেকে একজন  কাপুরুষ আর ঘৃণ‍্য  খুনের সহযোগকারী হয়ে আর বাঁচতে চাইনা।
 
"কাল মর্গের ২০২ নম্বর ড্রয়ারে রূপম তোর সাথে আর  একবার দেখা হলে, এবারে ক্ষমা করে দিস্ ভাই !" 
******************

ছায়াঢাকা বাড়ি--রবীন বসু


ছায়াঢাকা বাড়ি

 ( গল্প )

 রবীন বসু


রোজ কোচিংয়ে যাওয়া আসার পথে বাড়িটাকে দেখে শরণ্য। কেমন ছায়াঢাকা ভূতুড়ে । পাঁচিল দিয়ে ঘেরা বড় একতলা বাড়ি। সামনে পেছনে বাগান। বড় বড় প্রাচীন গাছ। কত পাখি আসে বিভিন্ন ঋতুতে।  বিচিত্র তাদের ডাক। কলকাতার মধ্যে এমন পাখিডাকা বাগান আছে, তা না দেখলে বিশ্বাসই হবে না।  এলাকার সব কিশোর-কিশোরীর আগ্রহ এই ছায়াঢাকা রহস্যঘন বাড়ি। ছোটবেলা থেকে শুনে আসছে এ বাড়ি সম্বন্ধে। লোকমুখে মৌচাক বাড়ি। আসলে বাড়ির যিনি মালিক সত্যব্রত চৌধুরী 'মৌচাক' পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। অবসর নিয়েছেন। পত্রিকা এখন একমাত্র ছেলে সুবিনয়ের দায়িত্বে। সে তার পরিবার নিয়ে থাকে সল্টলেক। সহকারী বিলাসকে উঃ শহর দক্ষিণ কলকাতার কসবা অঞ্চলে এতবড় বাড়িতে একা থাকেন সত্যব্রত চৌধুরী। বিলাস উড়িষ্যার লোক। খুব বিশ্বস্ত। 

শরণ্যর কৌতূহলের কারণ অবশ্য অন্য। তাদের বাড়িতে খবরের কাগজের সঙ্গে মাসিক মৌচাক পত্রিকা আসে। মা,কাকিমা আর অন্যান্য ভাইবোনদের সঙ্গে সেও পড়ে। বাবা বলেন, 'পড়ার বইয়ের সঙ্গে গল্পের বই ও অন্যান্য পত্র-পত্রিকা পড়লে শিশু-কিশোরদের কল্পনাশক্তির বিকাশ ঘটে আর চরিত্র গড়ে ওঠে।'

মৌচাক পত্রিকাটি সত্যি খুব সুন্দর । কত ছড়া, গল্প আর অ্যাডভেঞ্চারে ভরা থাকে। অপূর্ব সব ছবি। শরণ্য পড়ার ফাঁকে ফাঁকে গোগ্রাসে গেলে। তার মনে হয় সেও অমন লিখবে। কত ভাবনা, কত ছবি মনে ভাসে। একটা খাতা আলাদা করে রেখেছে লুকিয়ে। সেটাতে সে ছুটির দিনে কবিতা ছড়া লিখে রাখে। গত বছর তার একটা ছড়া ইস্কুল ম্যাগাজিনে ছাপাও হয়েছে। শরণ্য ভাবে একদিন মৌচাক বাড়িতে যাবে। সম্পাদক মহাশয়কে সামনাসামনি দেখার কৌতূহল । তার উপর আর একটা গোপন ইচ্ছাও ছিল ‌। তার লেখাগুলো দেখানো। সাহসে কুলায় নি। যদি বকে দেন। কিংবা বিরক্ত হন। কখনো বা বুকে একটু সাহস এনে ভাবে, যা হয় হোক। একবার যাবেই। 

হাফইয়ার্লি পরীক্ষা শেষ হতেই ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রীতমের বাড়িতে গেল শরণ্য। 'তোকে একটা কথা বলব, বল্ না করবি না!'

'কী কথা, বল্ ।' প্রীতম জানতে চায়।

'আমার সঙ্গে মৌচাক বাড়িতে যাবি?'

'মৌচাক বাড়ি ! না বাবা। ভয় করছে।'

'ভয়ের কী আছে! উনি বাঘ না ডাকাত ! আমরা যাব, আমার লেখার খাতাটা দেখাব। চলে আসব। প্লিজ চ'।' 

প্রীতম প্রিয় বন্ধুর অনুরোধ ফেলতে পারল না। আবার মনের কোণের ভয়টাও থেকে গেল। নিমরাজি হয়ে বলল, 'ঠিক আছে যাব তোর সাথে।'

শরণ্য হাতে চাঁদ পেল। পরের রবিবার সকালে টিফিন খাওয়ার পর লেখার খাতাটা জামার মধ্যে লুকিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল । প্রীতমকে রথতলা মোড়ে দাঁড়াতে বলেছিল। ওকে নিয়ে যখন মৌচাক বাড়ির গেটে গেল তখন বেলা প্রায় দশটা। অক্টোবর মাস। পুজো সামনে। বাগানে শিউলি ফুল ফুটেছে। মিষ্টি গন্ধ। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক উঁকিঝুঁকি মারার পর সাহস করে গেটে ধাক্কা দিল। বাগানের লন পার হয়ে মাঝবয়সি বিলাস এগিয়ে এল। ওদের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জিজ্ঞেস করল, 'কী চাই, খোকাবাবুরা?'

শরণ্য বলল, 'আমরা এসেছি সম্পাদক মশাইয়ের সাথে দেখা করতে।'

'কারণ!'

'কারণ কিছু না। আমার লেখা ওঁনাকে দেখাব।' 

'এসো তোমরা।'

বিলাস গেট খুলে দিল। ওকে ফলো করে ওরা বাগান পেরিয়ে বড় বসার ঘরে গিয়ে ঢুকল। সাদা চুল সৌম্য এক বৃদ্ধ ইজিচেয়ারে বসে বই পড়ছেন। এত বড় বসার ঘর এর আগে শরণ্য দ্যাখেনি। দেয়ালে যামিনী রায়, নন্দলাল বসুর বড় বড় ছবি। আলমারিতে বই ঠাসা। টিভি আছে। একপাশে সোফা আর অনেকগুলো কৌচ। তাদের পায়ের শব্দে ভদ্রলোক মুখ তুললেন। বিলাস বলল, 'বাবু, এরা এ পাড়ার ছেলে। আপনার সাথে দেখা করতে এসেছে।'

চোখে আগ্রহ এনে সত্যব্রতবাবু বললেন, 'তাই নাকি! তোমাদের নাম?'

শরণ্য আর প্রীতম নিজেদের নাম বলল। ভদ্রলোক এবার জানতে চাইলেন, 'তোমরা কোন ইস্কুলে, কোন ক্লাসে পড়?'

'আমরা এবার মাধ্যমিক দেব।' এরপর শরণ্য তাদের ইস্কুলের নাম বলল।

'বেশ, বেশ। তোমরা আমাদের পত্রিকা পড়? সাহিত্য ভালোবাসো?'

দুই বন্ধু ঘাড় নাড়ে। এবার সত্যব্রতবাবু বিলাসের দিকে চেয়ে বলেন, 'খোকাবাবুদের কিছু খেতে দাও।'

বিলাস ঘর থেকে বেরিয়ে গেল খাবার আনতে। শরণ্য পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল সম্পাদক মহাশয়ের সামনে।  তার লেখার খাতাটা ওঁনার দিকে বাড়িয়ে দিল। খাতাটা নিয়ে পাতা উলটে পড়লেন। 

'তোমার হাতের লেখা তো দেখছি চমৎকার। এখনকার ছেলেমেয়েদের হাতের লেখা তেমন ভালো হয়না। কিন্তু লেখক হতে গেলে হাতের লেখা সুন্দর হওয়া চাই‌। যাতে সম্পাদক মহাশয় তোমার লেখাটা আগ্রহ নিয়ে পড়েন। তুমি হাতের লেখায় পাশ করেছ। তবে, সব লেখা ভাল হয়নি। কিছু ভাল।'

তারপর খাতাটা শরণ্যর হাতে দিয়ে বললেন, 'এই যে ছড়া দুটো আমি টিক মেরে দিয়েছি, ওখানে টেবিলে দেখো প্যাডের কাগজ আছে, ভালো করে কপি করে দাও‌। লেখার শেষে ঠিকানা, বাবার নাম ও বাড়ির টেলিফোন নম্বর লিখবে।'

শরণ্য বাধ্য ছেলের মত কথা শুনল। লেখা কপি করে ওঁনার হাতে দিতেই বিলাস খাবার নিয়ে ঢুকল। খাওয়া শেষ হতে শরণ্য আর প্রীতম ওঁনার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।

'তোমরা গুড বয়‌। আজ তাহলে এসো। তবে পড়ার ফাঁকে ফাঁকে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকুমার রায় আর সত্যজিৎ পড়বে। তাহলে বড় হয়ে আরও ভাল লিখতে পারবে।' সেদিন মনে বেশ আনন্দ আর উৎসাহ নিয়ে বাড়ি ফিরল শরণ্য। 

মাস খানেক পর ইস্কুল থেকে ফিরে পড়ার ঘরে টেবিলে দেখল মৌচাক পত্রিকা। ডাকে এসেছে। তার নামে। প্রযত্নে বাবার নাম। শরণ্যর বুকটা ঢিপ করে উঠল। এক আকুল আগ্রহে সে পত্রিকার মোড়ক খুলে ফেলল।  সূচিপত্রে তার চোখ আটকে গেল। ছড়া/কবিতা বিভাগে তার 'শরৎরানি' ছড়াটি ছাপা হয়েছে। পত্রিকা হাতে একছুটে মায়ের ঘরে। বাবাও সেখানে ছিলেন। 

'এই দেখো, আমার লেখা ছাপা হয়েছে।' শরণ্য উৎফুল্ল। 

অন্যান্য ভাইবোনেরাও সব ঘরে এসে গেছে। মা হাসি মুখে পত্রিকাটা নিয়ে জোরে জোরে পড়ে শোনাল। সব্বাই হাততালি দিল। বাবা শুধু বললেন, 'তাহলে এবার আমাদের বাড়িটা লেখকবাড়ি হল।'

শরণ্যর চোখে ভাসছে শুধু সেই ছায়াঢাকা বাড়ি আর তার সৌম্য শুভ্রকেশ সম্পাদকের মুখ।

                         ••

স্ট্যাটাস / কৌস্তুভ দে সরকার


স্ট্যাটাস / কৌস্তুভ দে সরকার

"আপনার হাসি দিয়ে সমাজ বদলান, সমাজকে আপনার হাসি বদলাতে দেবেন না। সুস্থ মনই একটা সুন্দর জীবন তৈরি করে। মন ভালো রাখুন। Happy World Mentalhealth day." -
ফেসবুকে এক সুন্দরীর দেওয়া এরকম স্ট্যাটাস দেখে বেশ ভালোই লাগলো কুতুবের। ভাবলো, যাক এই মহিলা তাহলে জীবনের মানে কিছুটা হলেও বুঝেছে। মুক্তমনা, উদার, প্রগতিশীল এবং সমাজ বদলের অভিপ্রায়ী। সে দেখে মহিলার অমন স্ট্যাটাসের পরও কেউ সেখানে হাসির ইমোজি দেয়নি। লাইক, লাভ, এসব দিয়েছে। তাই কিছুটা ব্যতিক্রমী এবং স্ট্যাটাসের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভেবে সোৎসাহে তার স্ট্যাটাসের নীচে একটা হাসির ইমোজি টিপে দেয় কুতুব। কিন্তু পরক্ষণেই ধারণা পাল্টে যায় তার। হঠাৎ ম্যাসেঞ্জারে পিং। একটা ম্যাসেজ ঢুকেছে ওই মহিলার। একটা রাগী মুখের ইমোজি দিয়ে লেখা, "আপনি আমার পোস্টের নীচে হাসি দিলেন কেন? পোস্টটা কি হাস্যকর? এক্ষনি তুলে ফেলুন, নয়তো ব্লক করতে বাধ্য হবো। যত্তসব।" কুতুব অবাক হয়ে ভাবে আর বলে, "সেকি!আপনি নিজেই লিখেছেন, আপনার হাসি দিয়ে সমাজ বদলান, অথচ হাসির ইমোজি সহ্য নয়? কেন?" মহিলার রিপ্লাই আসে, "আপনাকে আমি চিনিনা জানিনা। তাছাড়া আমি কি আপনাকে ওখানে লাইক কমেন্ট করতে বলেছি? তুলে ফেলুন বলছি।" কুতুব বলে, "তাহলে ফ্রেন্ডলিস্টে রেখেছেন কেন?" মহিলার উত্তর, "রিকোয়েস্ট নিশ্চয়ই আপনি পাঠিয়েছিলেন। আপনাদের স্বভাবটাই এরকম। সুন্দরী দেখলেই ছোঁকছোঁক করতে থাকেন। বাড়িতে কেউ নেই নাকি?" ভেতরে ভেতরে বেদম ফুলতে থাকে কুতুব। আর ভাবে, কোথায় গিয়ে পৌঁছুচ্ছে এই সমাজ। কি অসভ্য মহিলারে বাবা। ফেসবুক করবে, ফ্রেন্ডলিস্টেও রাখবে, সাহসী প্রগতিশীল স্ট্যাটাসও দেবে, আবার সেখানে যথোচিত প্রয়োগ দেখলে তার উল্টো মানে করবে। কি যাচ্ছেতাই। ধুর। তারচেয়ে  একে ব্লক করে দেওয়া ভালো। এরকম বন্ধু থাকার চেয়ে না থাকাই ভালো। কুতুব ব্লক করতে যাবার আগেই দেখে something went wrong. This profile is unavaible. কুতুব বেশ বুঝতে পারে, এই সভ্য সমাজে কারো সাথে হাসি বিনিময় করার পরিণাম কী হতে পারে !...

লেখা--সান্ত্বনা চ্যাটার্জি


গল্প লেখা
সান্ত্বনা চ্যাটার্জি


সমীর কে গল্প লেখার জন্য ‘কাকতালীয় ‘ পত্রিকার সম্পাদক ফোন করেছিলেন। এখন তো উপন্যাস, বড় গল্প ,ছোটো গল্প , লেখা এবং পড়ার যুগ চলে গেছে। এখন অনু গল্পের যুগ, পরমানুতেও যেতে হতে পারে শীঘ্রই।।সমীর  পড়েছিল , পরমাণুর থেকেও ক্ষুদ্রকায় কিছু আছে।

লেখা এবং পড়ার বাইরেও যদি গল্প হতে পারে তাহলে পাঠক আর লেখকের তো দিন শেষ।
এক ই ব্যাপারে প্রকাশক এবং সম্পাদক সমাজ  বিশেষ চিন্তিত।।

বিজ্ঞানী রা কি গল্প পড়েন ? মনে তো হয় না।। 

সমীর একটা কালো কাগজে সাদা কালিতে লিখল, আজকের গল্প
“অন্ধকারে ঢাকা”।।

সম্পাদক সূচিপত্রে লেখক সমীর রায়ের পাশে লিখলেন “অদৃশ্য গল্প”।।

নৌকা ডুবি--শিখা মালিক



নৌকা ডুবি--শিখা মালিক                                                 
দাদা নৌকাটা কি সুন্দর  ভাসছে হাততালি দিয়ে খুশীতে চিৎকার  করে সীতা,ছয় বছর বয়স হবে ওর দাদা পাঁচ বছরের বড় ঝমঝম করে বৃষ্টি  হচ্ছে। দুভাইবোন খেলার আনন্দে মেতেছে ,দাদা ক্লাস ফাইভে পড়ে পুরানো খাতার পাতা ছিঁড়ে বোনকে নৌকা  বানিয়ে দিচ্ছে। মা রান্না ঘর থেকে হাঁক দেয় কিরে তোরা চুপ কেন পড়া কি বন্ধ?             চিৎকার করে কেঁদে ওঠে বোন দাদা কাছে এসে আদর করে ,কিরে বোন- বোন তখন হাত বাড়িয়ে দেখায় কাগজের নৌকা বৃষ্টির ফোঁটা পড়ে ডুবে গেছে,দাদা বলে আবার করে দেব।সন্ধ্যায় ওরা দাদুর কাছে রামায়নের গল্প  শোনায় ।দাদা বলে আচ্ছা  দাদু সীতা তো রানী তাহলে রাজপ্রাসাদে থাকলো কই?দাদু বলে তার ভাগ্যে লেখা ছিল ভাই ,দাদু বলে যাচ্ছে সীতার অগ্নিপরীক্ষা -ছোট্ট  নাতনী তখন কেঁদে ভাসায় দাদু বলে উনি মা লক্ষ্মী  কিছু  হবে না।
সময় গড়ায় তার নিয়মে ভাইবোন বড় হয়েছে তারা হারিয়েছে প্রিয় দাদুকে ,বোন সীতার আজ বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে কিন্তু কেন যে মেয়েটা সুখী নয় কেন যে মন খুলে হাসে না সেটা তার দাদা কিছুতেই বুঝতে পারেনা,কি সমস্যা বোনের জিজ্ঞাসা  করতে ভয় হয় হাসে না ছোট বেলার মত কাঁদেনা চিৎকার করে ,কেমন যেন চুপ থাকে কলের পুতুলের মত শুধু  কাজ করে চলে।অনেক দিন পরে বোনটা মা বাবা দাদার কাছে এলো দুদিন থাকতে চেয়েছিল কিন্তু  শ্বশুরবাড়ী থেকে ফোনের পর ফোন তাই চলে যেতে হবে ,সেদিন দুপুরে সবাই একসাথে খাওয়া  সারলো।লাল টুকটুকে শাড়িতে সে আজ সত্যিই  লক্ষ্মী প্রতিমা মা বলল সাবধানে যাস মা ,দাদা নদীর  ঘাট পর্যন্ত  এগিয়ে দিতে গেল ভরা নদী  সীতা নৌকায়  উঠলো দাদার দিকে তাকিয়ে ছিল যে দুই ভাইবোনের আর কোনোদিন দেখাই হবে না ,দাদা বলল সাবধানে  যাস -ভরা নদীতে ভর্তি  লোক নিয়ে নৌকা  এগিয়ে চললো মাঝ নদীতে  যেতেই একটা চিৎকার  উঠলো  দাদা পাড় থেকে দেখছে নৌকা  ডুবছে একটু দেরি না করে জলে ঝাঁপালো সে কতক্ষণ  খুঁজেছে মনে নেই  লাল শাড়ি পড়া বোনকে যখন পেল তখন সে চুপ নিথর শরীর টা জল থেকে তুলে আনলো আজ আর বোন কাঁদলো না বুক চাপড়ে কাঁদতে লাগলো দাদা।

বাংলো বাড়ি--বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

বাংলো বাড়ি
বিশ্বজিৎ রায় চৌধুরী

বোলেরো গাড়িটা চড়ে আমরা চলেছি নদীর কিনারায় বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ অরন্যের ভিতর দিয়ে একটা সরকারী বদান্যতায় তৈরি রাস্তা ধরে । আমরা বলতে আমি ড: স্নিকাশ বিসান্ত , আমার বড় শালা মেরিন ইঞ্জিনিয়ার রিসভ সাক্সেনা , আমার খুড়তুতো ভাই ক্রিকেট খেলোয়াড় প্যাট্রিক বিসান্ত ও আমার উঠতি বয়েসের শ্যালিকা  অ্যানথ্রোপলজি নিয়ে পাঠরতা লিজা রেহানা । সঙ্গের ড্রাইভার আমাদের গড় বয়েসের চেয়ে বছর সাত বেশিই হবে ভিক্টর লালথানহাওলা ।  চৌখস ড্রাইভার , বছর চব্বিশ পঁচিশ ড্রাইভিং লাইনে হল । 

যে রাস্তা দিয়ে আমরা চলেছি তা মহামান্য সরকার বাহাদুর নাও বানাতে পারতেন । কিন্তু চোরাই কাঠের ব্যবসায়ী ও অসাধু কাঠুরিয়া কিছু মানুষের দৌরাত্ম্যে ম্যানগ্রোভ অরণ্য প্রকৃতির ক্রোড় থেকে নিঃশেষ হতে বসেছে ।
তা বাঁচানোর মহৎ কর্তব্য পালন করা যাতে আয়াসসাধ্য হয় সেকারণেই এই চারচাকা চালানো যায় এমন রাস্তাটার দুর্ভেদ্য প্রবেশাধিকার । 

ঘন ম্যানগ্রোভের জঙ্গল আমাদের কাছে নতুন কিছু নয় । নতুন যে জিনিসটা হতে যাচ্ছে সেটা হল ওই দুর্ভেদ্য অরণ্যের মধ্যে যে দু'তিনটে পুরোনো বাংলো বাড়ি ইতিপূর্বে সরকার বানিয়ে রেখেছেন সেগুলোর আধুনিকীকরণ । আমরা এই রাস্তা ধরে যাব প্রায় পঁচিশ কিলোমিটার ।  নদী বরাবর জঙ্গল । ঘন জঙ্গলের বুক চিরে  ঔদ্ধত্যপূর্ণ  দৌরাত্ম্য দেখিয়ে যেন রাস্তায় আমাদের বোলেরো  গোঁ গোঁ শব্দে পৌঁছে যাবে বাংলো বাড়ি গুলোর চৌহদ্দির নাগালে । 

আমরা থম মেরে বোলেরোর আরাম নিতে নিতে উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছি এই ভোঁতা একঘেঁয়ে জার্নির শেষ তক । দু'একটা হরিণ , বন্য বরাহ , বিষাক্ত সাপ , বানর আমাদের রাস্তা কেটে বেরিয়ে যেতে দেখলাম । তারা আমাদের আক্রমন করার চেয়ে নিষ্ক্রান্ত হতেই বেশি উদ্যোগী মনে হল । আমার বড় শালার সঙ্গে লাইসেন্স প্রাপ্ত রাইফেল রয়েছে । রাইফেল শুটার হিসেবে মন্দ নয় । অন্ততঃ দেড়শো দুশো গজের রেঞ্জ ও পাল্লা নিতে পারে । প্যাট্রিক ও রাইফেল চালাতে জানে । সঙ্গে আনে নি । আর এটাতো শিকার যাত্রা নয় ।  আমরা চলেছি ওই বাংলো গুলোর রিকনস্ট্রাকশনের টেন্ডার নিয়েছেন যিনি সেই রেভেঞ্জ রিকনস্ট্রাকশন গ্রুপের ভারপ্রাপ্ত কর্তা মিঃ বিমান পালিতের বিশেষ আমন্ত্রণে । প্রকৃত অর্থে আমরা তাঁর অতিথি ও বন্ধু । আমরা অ্যাডভেঞ্চার করতে পছন্দ করি , এটা ওঁর অজানা নয় । 

বাংলো বাড়ি গুলোর মেরামতির কাজ দেখতে দেখতে অ্যাডভেঞ্চার করার অছিলায় রোমহর্ষক বৈচিত্র্যের স্বাদ নেওয়াও যাবে ।  

কিন্তু  সাইটের কাছাকাছি পৌঁছতে না পৌঁছতেই সন্ধে গড়িয়ে রাত নেমে গেল । নিস্তদ্ধ অরন্যের গভীর অন্ধকার থেকে বিচিত্র জীবজন্তুর ডাক ভেসে আসছে এমনভাবে যে একটা গা ছমছমে আবহ তৈরি হচ্ছে । বোলেরো হেড লাইটের আলোয় ওই বাংলো বাড়ি তিনটের হদিস করতে বাউন্ডারী ওয়াল ঘেঁষে রাস্তায় চলতে চলতে এন্ট্রান্স খুঁজতে গিয়ে প্রায় দিশাহারা । 

এ কেমন হলো । বাউন্ডারী ওয়াল দিয়ে ঘেরা মস্ত কম্পাউন্ডের রানিং কংক্রিটের স্ট্রাকচারের কোন জায়গায় এন্ট্রান্স নেই । আমাদের মনেহল কম্পাউন্ডের ভিতরে বড় বড় গাছপালার দুর্ভেদ্য অরন্য চিহ্ন দেখা গেলেও  এবং ঘড়ির কাঁটা ঘুরে ঘুরে পাক খেতে থাকলেও প্রবেশের পথ বন্ধ বা প্রবেশপথহীন । অথচ গাছপালার মধ্যে ঠাহর করলে বাংলো বাড়ির চিহ্ন যেন নজরে ঠেকে ।

ইতিমধ্যে আমার বিমান পালিতের নাম্বার সেভ করা মোবাইল থেকে ওর নাম্বারে ক্রমাগত কানেক্ট করার ব্যর্থ চেষ্টা করে , লিজাকে পালিতের নাম্বার দিয়ে ট্রাই করতে বললাম । 
" নট রিচেবল্  ", লিজা ব্যর্থ মনোরথ হয়েহতাশভাবে বলল ।  
রিসভ সাক্সেনা বলল , " গাড়ী স্টপ করে সমস্ত জানলার গ্লাস গুলো নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই । ফোনে কানেকশান পেলে আবার ট্রাই করতে হবে ।  "
" ও . কে. , অ্যাজ পার ইয়োর ওপিনিয়ন ।  "
আমরা যে এভাবে মহা ঘুমের অতলে তলিয়ে যাব কে জানতো বাবা । ভোরের আলো ভিতরে ঢুকতেই বাইরে তাকিয়ে আমরা তাজ্জব । আমরা একটা খালি মাঠের মতো জায়গায় হল্ট করে আছি ! 

শাস্তি--ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়


শাস্তি
ডাঃ অরুণ চট্টোপাধ্যায়

রমেনবাবু বড্ড রেগেছেন। মেয়ের অমন সুন্দর স্কার্টটা একেবারে কিনা পুড়িয়ে ঝামা করে দিয়েছে লন্ড্রি। মুখ কাঁচুমাচু করে মালিক বলল, বাবু বড্ড ভুল করে ফেলেছে আমার মেয়েটা। নাহয় দামটা আমি দিয়ে দেব।

-দাম? রমেনবাবু রেগে তো ফায়ার, আমার মেয়ের সাধের ফ্রক কত সাধ করে নিউ মার্কেট থেকে কিনেছিলুম। শুধু দাম দিলে হবে?

-বাবু বড্ড গরিব মেয়েটা। একটু যদি ক্ষমা করে দ্যান তো-

-ওসব হবে না। আমাকে সেই মেয়েটার কাছে নিয়ে চল। ওকে আমি শাস্তি দেব।

লন্ড্রির মালিক আর কি করবে। বড়লোকের খেয়াল। আর মালিক লোকটাও খুব নিরীহ ছিল। অগত্যা পরের দিন রমেনবাবুকে নিয়ে চলল মেয়েটির কাছে। রমেনবাবুর হাতে একটা প্যাকেট।

-এই নাও।

ভীত মেয়েটি প্যাকেট খুলল কাঁপা হাতে। বেরোল ঠিক সেই রকম একটা স্কার্ট যেটা পুড়ে গিয়েছিল।

মালিক তো অবাক। বলল, সেকি শাস্তির বদলে পুরস্কার স্যার?

পুরস্কার? বাঁকা হেসে রমেনবাবু মনে মনে বললেন, পরে বুঝবে ঠেলাটা।

পরের দিন লন্ড্রি বন্ধ ছিল। মেয়েটি ভাবল নতুন সেই জামাটা পরে বাইরে একটু ঘুরে আসে। এত সুন্দর জামা তার হবে সে স্বপ্নেও ভেবে পায় নি। ঝলমলে জামাটা পরে একটা ভাঙ্গা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ দেখল নিজেকে। মুগ্ধ হয়ে দেখতে দেখতে তার মনে হল যেন সে নয় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রঙিন এক প্রজাপতি। ডানা মেলে ওড়ার মত সে ছুটে বেরোতে চাইল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কে যেন তার পা টেনে ধরল। হঠাৎ তার মনে হল, আরে এটা কি হল? ভদ্রলোকের মেয়ের এমন সাধের জামাটা সে পুড়িয়ে দিয়ে আবার নিজেই সেই রকম জামা পরে বেরোবে? তার বয়েসী ছোট্ট মেয়েটার অদেখা মুখ ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। কিন্তু সেই বা কি করে? জামাটা সে তো আর ইচ্ছে করে পোড়ায় নি? অসতর্ক ভাবে পুড়ে গেছে। কিন্তু মনে হল তার তো সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। হয়ত জামাটা পুড়ে যাওয়ার জন্যে তার বয়েসী মেয়েটি খুব দুঃখ পেয়েছিল। সুন্দর জামাটা পেয়ে সে যেমন প্রথমে আনন্দিত হয়েছে ঠিক তেমনই সেটা পুড়ে যেতে ওই মেয়েটির মনে ততটাই আঘাত লেগেছে।

এরপর থেকে যতবার জামাটা সে পরতে গেছে কিছুতেই পরতে পারে নি। পরার মুহূর্তেই মেয়েটির মুখখানা তার চোখে ভাসে। কিন্তু মালিককে তো এটা ফিরিয়ে দিতে বলা যায় না। তাহলে মানী মানুষের মানহানি হতে পারে। কিন্তু সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল আর অন্যের পয়সায় নয়, নিজের রোজগার দিয়ে জামা কিনে সে পরবে। যেমন সাধ্য তেমন পরবে। আর যে চাকরিতে পরের ক্ষতি হবার সম্ভাবনা সে চাকরি সে করবে না।

লন্ড্রির চাকরি ছেড়ে সে একটা লাইব্রেরির ফাই-ফরমাশ খাটা চাকরি নিল। বইয়ের পাহাড় দেখে তার চোখ যেমন জুড়িয়ে গেল মনও তেমন ভরে গেল। আহা এ যেন এক নতুন জগতে ঢুকেছে সে যেন এক নতুন স্বর্গে।

বইকে ভালপবাসতে শিখেছিল সে। বই তাকে পথ দেখাল। অন্ধকার থেকে আলোর পথ। প্রাথমিক মাধ্যামিক পাঠের সীমা ডিঙ্গিয়ে সে চলে গেল ডাক্তারি ক্লাস করতে। আজ সে একজন নিবিষ্ট চিকিৎসক। পেশাদারিত্বকে সঙ্গে নিয়েও সে খুলল চ্যারিটেবল ডিসপেনসারি। এছাড়াও সে তার সঞ্চিত রোজগার থেকে গরিবদের সাহায্য করত।

আজও সে ভোলে নি তার শৈশবের কথা। সেই জামা পুড়ে যাওয়ার কথা। প্রতি পুজোয় সে চেষ্টা করে শিশুদের মধ্যে সাধ্যমত জামা বিতরণ করতে। রমেনবাবুর সেই মেয়েটির অদেখা মুখ সে আজ দেখতে পায় সব শিশুদের মধ্যে।

প্রাপ্তি--অদিতি ঘটক

প্রাপ্তি অদিতি ঘটক কেসটা সাজাতে গিয়ে বারবার তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে, অথচ হাতে সময় খুব কম। তাড়াতাড়ি এফ. আই. আর. এর খসড়াটা  তৈরি করতে হবে। পরমার্...